কাল ও পরশু ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলন


মাইজভাণ্ডারী মহাত্মাদের দর্শন প্রচার ও আউলিয়ায়ে কেরামের সূফিতাত্ত্বিক আদর্শে সৎ ও পরিশুদ্ধ মানুষ গড়ার লক্ষ্যে আগামীকাল শুক্রবার ও পরদিন শনিবার বিকাল ৫টায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর আয়োজনে ৩য় আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আলহাজ্ব এম. মনজুর আলম। কবি ইশরাফ হোসেন (মালয়েশিয়া), দাতো বাহার উদ্দিন আহমদ (মালয়েশিয়া), ড. নূর মোহাম্মদ ওসমানী (মালয়েশিয়া), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ড. আ ন ম রইস উদ্দীন, প্রফেসর ড. আল্লামা সৈয়দ শামীম উদ্দিন আহমেদ মুনায়েমী (ভারত), প্রফেসর ড. ইব্রাহিম হোসেন জেইন (মালয়েশিয়া), এসির ইজিয়ক (তুরস্ক), ঢাকা টার্কিশ হোপ স্কুলের প্রিন্সিপাল বায়রাম সাচি, মাইজভাণ্ডারী মরমী গোষ্ঠীর সভাপতি অধ্যাপক এ ওয়াই এম জাফর, শাহান শাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের সচিব ও গবেষক এ এন এ মোমিন প্রমুখ দেশি-বিদেশি সূফি ভাবাপন্ন গবেষক-বুদ্ধিজীবীগণ আলোচক হিসেবে আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী দিবস শুক্রবার সকাল ১০টায় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলন শুরু হবে। উদ্বোধন করবেন মাইজভাণ্ডার শরীফ গাউছিয়া হক মঞ্জিলের সাজ্জাদানসীন রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (ম.জি.আ.)। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে খুলশীস্থ বিজিএমইএ মিলনায়তনে আলহাজ্ব সালাউদ্দিন কাসেম খানের সঞ্চালনায় সমসাময়িক কালের বিশ্বে সূফিবাদ, বস্তুবাদ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবস্থা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দুইদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে অংশগ্রহণের জন্য মাইজভাণ্ডারী একাডেমির পক্ষ হতে আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Posted in Uncategorized | Comments Off

মাইজভান্ডারী দর্শনের উৎপত্তি

মাইজভাণ্ডারী গান – ও নিদানের বন্ধু – YouTube
হযরত গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (রঃ), হযরত গাউসুল আজম আবদুল কাদের জ্বিলানী (কঃ)-এর বংশধর ও কাদেরীয়া ত্বরীকার খেলাফত প্রাপ্ত গাউছে কাওনাইন শেখ সৈয়দ আবু শাহামা মোহাম্মদ সালেহ কাদেরী লাহোরী (রঃ) ও তাঁর অগ্রজ চিরকুমার হযরত শাহ দেলওয়ার আলী পাকবাজ (রঃ)-এর সান্নিধ্যে থেকে রিয়াজত সাধনায় উচ্চ শ্রেণীর ফয়েজ ও কামালিয়ত অর্জন করেন। গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) তওহীদে আদয়্যান বা ধর্ম সাম্যমূলক একেশ্বরবাদের প্রতি মানবজাতিকে আহ্বান জানালেন। মানুষের আত্মার মুক্তি এবং উন্নয়নের জন্য কাদেরীয়া ত্বরীকার সাথে সমন্বয় সাধন করে মাইজভান্ডারী ত্বরীকার প্রবর্তন করলেন।

 

Posted in দর্শণ | Comments Off

স্মরণ : শাহসূফী হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারী (ক.)

পাকভারতে মুসলিম রাজত্বের আমলে বাগদাদ নগর নিবাসী এক বিশিষ্ট সৈয়দ পরিবার দিল্লী শহরে আগমন করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া তাঁদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হওয়ায় তাঁরা সেই স্থান থেকে বাংলার রাজধানী গৌড় নগরে পদার্পণ করেন।তখন ইলিয়াস শাহী বংশের বিখ্যাত বাদশাহ গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ বাংলার পরাক্রমশালী স্বাধীন নরপতি ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল। তিনি অতি ধর্মভীরু ও ন্যায়পরায়ণ রাজা ছিলেন।
তিনি জগদ্বিখ্যাত পারস্য কবি মাননীয় হাফেজের সাথে পত্রালাপ করতেন। তাঁর সভাসদগণের সকলেই জ্ঞানবান ছিলেন। দরবারে ধার্মিক ও জ্ঞানীর যথেষ্ট সমাদর ছিল।কথিত আছে যে, উপরোক্ত বাগদাদ নগর নিবাসী সৈয়দ পরিবারে বহু লোক ধার্মিক, জ্ঞানী, যুদ্ধ-নিপুণ, খোদাভীরু ও অলি দরবেশ ছিলেন। বাদশাহ তাঁদের অতি সম্মান ও আদরের সাথে গ্রহণ করেন এবং ব্যক্তিগত উপযুক্ততা অনুসারে শাহী খান্দানের গৃহশিক্ষক, শাহী মসজিদের ইমাম, বিচারালয়ের কাজী এবং সেনানায়ক পদে নিযুক্ত করেন। এইভাবে তাঁরা বংশানুক্রমে প্রায় দুইশত বৎসরের অধিককাল বাংলার রাজধানী গৌড় নগরে পরম সুখে ও সম্মানের সাথে কালাতিপাত করেন। একসময় গৌড়ের সুলতান যুদ্ধে পরাজিত হন এবং গৌড় নগরে বসন্তরোগ মহামারী রূপে দেখা দেয়। দলে দলে নগরবাসী গৌড় ছাড়তে থাকে। পূর্ব থেকেই গৌড় নগরবাসী সৈয়দ পরিবারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চট্টলা। উপরোক্ত গৌড়ীয় সৈয়দ পরিবারের অপর সদস্য সৈয়দ সুলতান (১৫৫০খ্রি.-১৬৪৮খ্রি.) মতান্তরে কাজী সৈয়দ হামিদুদ্দিন শাহ গৌড় নগর থেকে চট্টগ্রাম এসে পটিয়া থানার অন্তর্গত চক্রশালায় বসবাস শুরু করেন।তিনি একজন ইসলাম ধর্ম প্রচারক, প্রসিদ্ধ কামেল পীর ছিলেন। তাঁর বংশধরের মধ্যে সৈয়দ আব্দুল কাদের শাহ অন্যতম। একদা তিনি চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত আজিম নগর গ্রামে হিজরত করেন। তাঁরই পুত্র সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ। সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহের পুত্র সৈয়দ তৈয়বুল্লাহ শাহ। সৈয়দ তৈয়বুল্লাহ শাহের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র সৈয়দ মতিউল্লাহ শাহ মাইজভান্ডার গ্রামে বসবাস করেন। এই স্থানে সৈয়দ মতিউল্লাহ শাহের তিনপুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে সৈয়দ আবদুল করিম আল হাসানী আল মাইজভান্ডারী ও সৈয়দা মোশাররফ জান বিবির কোলে ২৭ আশ্বিন হযরত শাহসূফী আল সৈয়দ গোলামুর রহমান আল হাসানী আল মাইজভান্ডারী প্রকাশ বাবা ভান্ডারী কেবলা জন্মগ্রহণ করেন। হযরত শাহসূফী মাওলানা আল সৈয়দ গোলামুর রহমান আল হাসানী আল মাইজভান্ডারী কেবলা কাবা (ক.) হযরত কেবলা কাবা (ক.)-এর স্থলাভিষিক্ত ত্বরীকা-এ মাইজভান্ডারীয়ার পূর্ণ প্রতিষ্ঠাতা। আল্লাহ প্রেমে বিভোর জন সমাগমের মহা স্বর্গীয় সমারোহে মাইজভান্ডার শরীফে প্রতিবছর ২৭ শে আশ্বিন পবিত্র খোশরোজ উদযাপিত হয়ে থাকে। তিনি শৈশব থেকেই ধর্মের প্রতি আসক্ত ছিলেন। সাত বৎসর বয়স থেকে তাকে নামাজ রোজা অভ্যস্ত দেখা গিয়েছিল। নির্জনতায় প্রিয় শিশু গাউছ গ্রাম্য মক্তবের শিক্ষা সমাপন করে উচ্চতর দ্বীনি এলেম, শিক্ষাকালে ১৫ বৎসর বয়সে ‘ছায়েমুদ্দায়ার’ অর্থাৎ সারা বৎসর রোজা রাখতেন। মাদ্রাসার ছুটির ফাঁকে ফাঁকে তাঁর জেঠা পীর হযরত কেবলা কাবা (ক.) এর নিকট প্রায়শঃ হাজির থাকতেন। করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের অভিলাষে পাঠ্যাবস্থা থেকেই কঠোর সাধনায় রত থাকতেন এবং ২৮ বৎসর বয়সে পীরের রুহানীয়তের যাবতীয় আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁর আত্মায় সঞ্চারিত হয়। হযরত ছাহেব কেবলা কাবা (ক.) নিজ হস্তে স্বীয় জোববা মোবারক তাকে পরিয়ে দেন। অতঃপর বাবাজান কেবলা কাবা (ক.) আল্লাহ পাকের একত্বের তৌহিদ আহরণে চলে গেলেন পার্বত্য অঞ্চলের গভীর অরণ্যে। দীর্ঘ ১২ বৎসরকাল সাধনা পরিপূর্ণ করে ফিরে আসেন নিজ বাসস্থান মাইজভান্ডার শরীফে। সাধনা, সংযম ও আধ্যত্মিক শক্তির প্রভাবে সংসারের সাথে সকল সম্পর্ক ছেদ করে গোশানশীল অবস্থায় থাকেন। দুই বৎসর পর থেকে ২৩ বৎসর যাবত জবান মোবারক বন্ধ রাখেন। সবাই বিস্ময়ে নির্বাক, তাঁর হস্ত মোবারকদ্বয়ে পানি ঢালার অপরূপ দৃশ্য দেখে। ঐ পানির উছিলায় মকছুদ পূরণ ও কত না বেদনা উপশম হত। তিনি আল কোরআনের মর্মকথা, তৌহিদের মূলমন্ত্রে প্রণীত ত্বরীকা এ মাইজভান্ডারীয়ার নির্দেশিত পথে মানুষকে দিয়েছেন খোদাপ্রাপ্তির সহজ ও সরল পথের দিশা, জানিয়েছেন রহমানুর রাহিমের অফুরন্ত সওগাত। বাবা ভান্ডারী কেবলা (ক.) বেলায়ত প্রাপ্তি এবং বুজুর্গীয় গৌরবোজ্জ্বল পূণ্যে মাইজভান্ডার শরীফ ধন্য। তাঁর আধ্যত্মিক ছোঁয়ায় এসে দ্বীন দুনিয়া দো-জাহানের ত্বরক্কী লাভ করতে দরবারে পাকে আগত মুসলমান ছাড়াও ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সর্বকালের সকল জায়েরীনদের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। মাইজভান্ডারী ত্বরীকা নবুয়্যতে মোহাম্মদীয় জাতে পাকে আত্মপ্রকাশ। সেইরূপ এই বেলায়তের ধারা পদ্ধতি অনুযায়ী ফয়েজ বিতরণে সমর্থ। হযরত বাবা ভান্ডারী কেবলা (ক.) ২২ চৈত্র ১৩৪৩ বাংলা, ৫ এপ্রিল ১৯৩৭ ইংরেজী, ২২ মহরম ১৩৫৩ হিজরী রোজ সোমবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে ৭১ বৎসর ৬ মাস বয়সে তাঁর প্রভুর সাথে মহামিলনের ইচ্ছায় চলে গেলেন (ইনালিল্লাহে……..রাজেউন)। প্রতি বৎসরই ২২শে চৈত্র লক্ষ লক্ষ শোকাতুর আশেকের আগমনে ভরে উঠে মাইজভান্ডার শরীফের প্রাঙ্গণ। এই পবিত্র দিনে প্রতিটি মুহূর্তে আসক্তজন ‘‘আল্লাহু আল্লাহু’’ জিকিরে মত্ত থেকে স্ব স্ব কামনা ও বাসনা পূর্ণ করে নিজ নিজ স্থানে ফিরে যায়।
‘‘বায়াত’’ শব্দটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিক্রি হওয়া। যাকে ত্বরীকতের পরিভাষায় পীরের হাতে হাত রেখে চাদর ধরে বা পাগড়ী ধরে গুনাহ হতে তাওবাকরতঃ আবদ্ধ হওয়াকে কথ্য ভাষায় মুরিদ বলা হয়। এই মুরিদ আল্লাহ ও রাসূলের সমস্ত নিয়মনীতির মাধ্যমে পীরের নির্দেশনা ও পরামর্শ মেনে চলে।
ত্বরীকাতে কামিয়াব হওয়ার পূর্বশর্ত হল নিজ মুর্শিদের প্রতি একান্ত মহববত। একত্ববাদ ও আন্তরিক আকর্ষণ থাকা। মুর্শিদের প্রতি ভক্তি ও তাজিমে থাকাই প্রধান আদর্শ বা শর্ত। ‘‘হযরত মাওলানা আল সৈয়দ গোলামুর রহমান আল হাসানী আল মাইজভান্ডারী প্রকাশ বাবা ভান্ডারী কেবলার দেখানো সহজ-সরল পথ অবলম্বন করে সেই সংস্পর্শ ও তৌহিদের অনুকূলে যে গমন করতে থাকবে ‘‘ইনশাল্লাহ’’ অনতিবিলম্বে সেই নূরে মোহাম্মদীর নূরকে চিনতে সক্ষম হব।
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর সকল নবী আসমানী কিতাব, কেয়ামত ও তকদীরের উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনয়ন কর। খাঁটি অন্তরে দ্বীন ইসলাম ও তাওহীদে সমর্পিত হও এবং তৎ পর্যন্ত পৌঁছিতে উছিলা বা অবলম্বন খোঁজ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফীক দান করুন। আমিন।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

যে চৌদ্দটি আমলে রিজিক বাড়ে

মুসলিম মাত্রেই বিশ্বাস করেন যে তার আয় ও উপার্জন, জীবন ও মৃত্যু, এবং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য ইত্যাদি র্নিধারণ হয়ে যায় যখন তিনি মায়ের উদরে থাকেন। আর এসব তিনি লাভ করেন তার জন্য বরাদ্দ উপায়-উপকরণগুলোর মাধ্যমে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ সংগ্রহে চেষ্টা করা। যেমন চাষাবাদ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প-চারু, চাকরি-বাকরি বা অন্য কিছু। আল্লাহ তা‌‘আলা বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ ذَلُولٗا فَٱمۡشُواْ فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُواْ مِن رِّزۡقِهِۦۖ وَإِلَيۡهِ ٱلنُّشُورُ ١٥﴾ [الملك: ١٥]

‘তিনিই তো তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিযক থেকে তোমরা আহার কর। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।’ {সূরা আল-মুলক, আয়াত : ১৫}

আজ আমরা রিজিক বৃদ্ধির উপায়সমূহের মধ্যে কুরআন ও হাদীস রোমন্থিত ১৪টি আমলের কথা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

প্রথম আমল : তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা

আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করা, তাঁর নির্দেশাবলি পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা। পাশাপাশি আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, তাওয়াক্কুল করা এবং রিজিক তালাশে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‌

﴿ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمۡرِهِۦۚ قَدۡ جَعَلَ ٱللَّهُ لِكُلِّ شَيۡءٖ قَدۡرٗا ٣ ﴾ [الطلاق : ٢، ٣]

‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ {সূরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩}

অর্থাৎ যে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আনুগত্য দেখাবে, আল্লাহ তার সকল সংকট দূর করে দেবেন এবং তার কল্পনাতীত স্থান থেকে রিজিকের সংস্থান করে দেবেন। আর যে কেউ তার উদ্দেশ্য হাসিলে একমাত্র আল্লাহর শরণাপন্ন হয় তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বলাবাহুল্য এই তাকওয়ার পরিচয় মেলে হালাল উপার্জনে চেষ্টা এবং সন্দেহযুক্ত কামাই বর্জনের মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় আমল : তাওবা ও ইস্তেগফার করা

অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও রিজিক বাড়ে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অন্যতম নবী ও রাসূল নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে ইরশাদ করেন,

﴿ فَقُلۡتُ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ إِنَّهُۥ كَانَ غَفَّارٗا ١٠ يُرۡسِلِ ٱلسَّمَآءَ عَلَيۡكُم مِّدۡرَارٗا ١١ وَيُمۡدِدۡكُم بِأَمۡوَٰلٖ وَبَنِينَ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ جَنَّٰتٖ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ أَنۡهَٰرٗا ١٢ ﴾ [نوح: ١٠، ١٢]

‘আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। (তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে) ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ‘আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’। {সূরা নূহ, আয়াত : ১০-১২}

হাদীসে বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ ».

‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ [আবূ দাঊদ : ১৫২০; ইবন মাজা : ৩৮১৯; তাবরানী : ৬২৯১][1]

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« مَنْ أَكْثَرَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ».

‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’ [বাইহাকী : ৬৩৬; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ সহীহ সূত্রে বর্ণিত।]

তৃতীয় আমল : আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা

আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের হক আদায়ের মাধ্যমেও রিজিক বাড়ে। যেমন : আনাস ইবন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন,

« مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ».

‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।’ [বুখারী : ৫৯৮৫; মুসলিম : ৪৬৩৯]

চতৃর্থ আমল : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠেও রিজিকে প্রশস্ততা আসে। যেমনটি অনুমিত হয় নিম্নোক্ত হাদীস থেকে। তোফায়েল ইবন উবাই ইবন কা‘ব রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন,

قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّى أُكْثِرُ الصَّلاَةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاَتِى فَقَالَ « مَا شِئْتَ ». قَالَ قُلْتُ الرُّبُعَ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قُلْتُ النِّصْفَ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ. قَالَ « مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ ». قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلاَتِى كُلَّهَا. قَالَ « إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ ». قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ.

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার প্রতি অধিকহারে দরূদ পড়তে চাই, অতএব আমার দু‘আর মধ্যে আপনার দরূদের জন্য কতটুকু অংশ রাখব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ। তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে যদি তুমি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমার দু‘আর পুরোটা জুড়েই শুধু আপনার দরূদ রাখব। তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার ঝামেলা ও প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। [তিরমিযী : ২৬৪৫; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ (আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি ‘হাসান’ সহীহ।)]

পঞ্চম আমল : আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা

আল্লাহর রাস্তায় কেউ ব্যয় বা দান করলে তা বিফলে যায় না। সে সম্পদ ফুরায়ও না। বরং তা বাড়ে বৈ কি। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ قُلۡ إِنَّ رَبِّي يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ وَيَقۡدِرُ لَهُۥۚ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ ٣٩ ﴾ [سبا: ٣٩]

‘বল, ‘নিশ্চয় আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিযকদাতা।’ {সূরা আস-সাবা’, আয়াত : ৩৯}

ষষ্ঠ আমল : বারবার হজ-উমরা করা

হজ ও উমরা পাপ মোচনের পাশাপাশি হজকারী ও উমরাকারীর অভাব-অনটন দূর করে এবং তার সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। আবদুল্লাহ ইব্ন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ ».

‘তোমরা হজ ও উমরা পরপর করতে থাক, কেননা তা অভাব ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন দূর করে দেয় কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লাকে।’ [তিরমিযী : ৮১৫; নাসাঈ : ২৬৩১]

সপ্তম আমল : দুর্বলের প্রতি সদয় হওয়া বা সদাচার করা

মুস‘আব ইবন সা‘দ রাদিআল্লাহু আনহু যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে কল্পনা করলেন, তিনি বোধ হয় তাঁর বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্য হেতু অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি মর্যাদাবান। সেই প্রেক্ষিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

« هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلاَّ بِضُعَفَائِكُمْ » .

‘তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে কেবল তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক প্রদান করা হয়।’ [বুখারী : ২৮৯৬]

অষ্টম আমল : ইবাদতের জন্য ঝঞ্ঝাটমুক্ত হওয়া

আল্লাহর ইবাদতের জন্য ঝামেলামুক্ত হলে এর মাধ্যমেও অভাব দূর হয় এবং প্রাচুর্য লাভ হয়। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِى أَمْلأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلاَّ تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ ».

‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।’ [তিরমিযী : ২৬৫৪; মুসনাদ আহমদ : ৮৬৮১; ইবন মাজা : ৪১০৭]

নবম আমল : আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করা

আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে হিজরত তথা স্বদেশ ত্যাগ করলে এর মাধ্যমেও রিজিকে প্রশস্ততা ঘটে। যেমনটি অনুধাবিত হয় নিচের আয়াত থেকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ۞وَمَن يُهَاجِرۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ يَجِدۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُرَٰغَمٗا كَثِيرٗا وَسَعَةٗۚ وَمَن يَخۡرُجۡ مِنۢ بَيۡتِهِۦ مُهَاجِرًا إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ يُدۡرِكۡهُ ٱلۡمَوۡتُ فَقَدۡ وَقَعَ أَجۡرُهُۥ عَلَى ٱللَّهِۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ١٠٠ ﴾ [النساء : ١٠٠]

‘আর যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করবে, সে যমীনে বহু আশ্রয়ের জায়গা ও সচ্ছলতা পাবে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে মুহাজির হয়ে নিজ ঘর থেকে বের হয় তারপর তাকে মৃত্যু পেয়ে বসে, তাহলে তার প্রতিদান আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১০০}

আয়াতের ব্যাখ্যা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস প্রমুখ সাহাবী রাদিআল্লাহু আনহুদ বলেন, স্বচ্ছলতা অর্থ রিজিকে প্রশস্ততা।

দশম আমল : আল্লাহর পথে জিহাদ

একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জিহাদেও সম্পদের ব্যপ্তি ঘটে। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মাধ্যমে সংসারে প্রাচুর্য আসে। যেমন ইবন উমর রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي ».

‘আর আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে।’ [মুসনাদ আহমদ : ৫৬৬৭; বাইহাকী : ১১৫৪; শু‘আবুল ঈমান : ১৯৭৮৩]

একাদশ আমল : আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা

সাধারণভাবে আল্লাহ যে রিজিক ও নিয়ামতরাজি দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া করা এবং তাঁর স্তুতি গাওয়া। কারণ, শুকরিয়ার ফলে নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧ ﴾ [ابراهيم: ٧]

‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন।’ {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ০৭}

আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা শুকরিয়ার বদৌলতে নেয়ামত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আর বলাবাহুল্য আল্লাহর বাড়ানোর কোনো সীমা-পরিসীমা নাই।

দ্বাদশ আমল : বিয়ে করা

আজকাল মানুষের দুনিয়ার প্রাচুর্য ও বিলাসের প্রতি আসক্তি এত বেশি বেড়েছে, তারা প্রচুর অর্থ নেই এ যুক্তিতে প্রয়োজন সত্ত্বেও বিয়ে বিলম্বিত করার পক্ষে রায় দেন। তাদের কাছে আশ্চর্য লাগতে পারে এ কথা যে বিয়ের মাধ্যমেও মানুষের সংসারে প্রাচুর্য আসে। কারণ, সংসারে নতুন যে কেউ যুক্ত হয়, সে তো তার জন্য বরাদ্দ রিজিক নিয়েই আসে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَأَنكِحُواْ ٱلۡأَيَٰمَىٰ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰلِحِينَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَإِمَآئِكُمۡۚ إِن يَكُونُواْ فُقَرَآءَ يُغۡنِهِمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ ٣٢ ﴾ [النور : ٣٢]

‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ {সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২}

উমর ইবন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুমা বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

ত্রয়োদশ আমল : অভাবের সময় আল্লাহমুখী হওয়া এবং তার কাছে দু‘আ করা

রিজিক অর্জনে এবং অভাব দূরীকরণে প্রয়োজন আল্লাহর কাছে দু‘আ করা। কারণ, তিনি প্রার্থনা কবুল করেন। আর আল্লাহ তা‘আলাই রিজিকদাতা এবং তিনি অসীম ক্ষমতাবান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ ﴾ [غافر: ٦٠]

‘আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’ {সূরা আল-মু‘মিন, আয়াত : ৬০}

এ আয়াতে আল্লাহ দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন আর তিনি তা কবুলের জিম্মাদারি নিয়েছেন। যাবৎ না তা কবুলে পথে কোনো অন্তরায় না হয়। যেমন ওয়াজিব তরক করা, হারাম কাজে জড়ানো, হারাম আহার গ্রহণ বা হারাপ পরিচ্ছদ পরা ইত্যাদি এবং কবুলকে খানিক বিলম্বিতকরণ। আল্লাহর কাছে দু‘আয় বলা যেতে পারে,

‘হে রিজিকদাতা আমাকে রিজিক দান করুন, আপনি সর্বোত্তম রিজিকদাতা। হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে পবিত্র সুপ্রশস্ত রিজিক চাই। হে ওই সত্তা, দানের ঢল সত্ত্বেও যার ভাণ্ডারে কমতি হয় না। হে আল্লাহ, আমাকে আপনি আপনার হালাল দিয়ে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন আর আপনার দয়া দিয়ে আপনি ছাড়া অন্যদের থেকে যথেষ্ট হয়ে যান। হে আল্লাহ আপনি আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন তা দিয়েই সন্তুষ্ট বানিয়ে দিন। আর যা আমাকে দিয়েছেন তাতে বরকত দিন।’

অভাবকালে মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর শরণাপন্ন হলে এবং তাঁর কাছেই প্রাচুর্য চাইলে অবশ্যই তার অভাব মোচন হবে এবং রিজিক বাড়ানো হবে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« مَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ وَمَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِاللَّهِ فَيُوشِكُ اللَّهُ لَهُ بِرِزْقٍ عَاجِلٍ أَوْ آجِلٍ ».

‘যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়, অতপর তা সে মানুষের কাছে সোপর্দ করে (অভাব দূরিকরণে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়), তার অভাব মোচন করা হয় না। পক্ষান্তরে যে অভাবে পতিত হয়ে এর প্রতিকারে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয় তবে অনিতবিলম্বে আল্লাহ তাকে তরিৎ বা ধীর রিজিক দেবেন। [তিরমিযী : ২৮৯৬; মুসনাদ আহমদ : ৪২১৮]

চতুর্দশ আমল : গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দীনের ওপর সদা অটল থাকা এবং নেকীর কাজ করে যাওয়া।

গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দীনের ওপর অটল থাকা এবং নেকীর কাজ করা- এসবের মাধ্যমেও রিজিকের রাস্তা প্রশস্ত হয় যেমন পূর্বোক্ত আয়াতগুলো থেকে অনুমান করা যায়।

তবে সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা দুনিয়াতে চিরদিন থাকার জন্য আসি নি। তাই দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে উচিত হবে আখিরাতকে অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেয়া। আমাদের এদেন অবস্থা দেখে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧ ﴾ [الاعلى: ١٦، ١٧]

‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখিরাত সর্বোত্তম ও স্থায়ী।’ {সূরা আল-আ‘লা, আয়াত : ১৬-১৭}

আর পরকালের মুক্তি ও চিরশান্তিই যার প্রধান লক্ষ্য তার উচিত হবে রিজিকের জন্য হাহাকার না করে অল্পে তুষ্ট হতে চেষ্টা করা। যেমন : হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আ‘স রাদিআল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ ».

‘ওই ব্যক্তি প্রকৃত সফল যে ইসলাম গ্রহণ করেছে আর তাকে জীবন ধারণে (অভাবও নয়; বিলাসও নয়) পর্যাপ্ত পরিমাণ রিজিক দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তুষ্টও করেছেন। [মুসলিম : ২৪৭৩; তিরমিযী : ২৩৪৮; আহমদ : ৬৫৭২]

পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের এসব উপায়-উপকরণ যোগাড় করে রিজিক তথা হালাল উপার্জনে উদ্যোগী ও সফল হবার তাওফীক দান করেন। তিনি যেন আপনাদের রিজিক ও উপার্জনে প্রশস্ততা দান করেন। আমীন।

——————————————————————————–

[1]. (শায়খ উসাইমীন বলেন, সনদগত দিক থেকে হাদীসটি দুর্বল কিন্তু এর মর্ম ও বক্তব্য সহীহ বা সঠিক। কুরআনের আয়াত ও হাদীসে এই বক্তব্যের সমর্থন বিদ্যমান। এই হাদীস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর শায়খ বিন বায বলেন, সর্বোপরি হাদীসটি তারগীব ও তারহীব তথা মানুষকে আখিরাতের আগ্রহ বা ভয় দেখানোর ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। কারণ, এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহে একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। [ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারবি (হাদীসের ব্যাখ্যা ও তার হুকুম।]

Posted in Uncategorized | Leave a comment

২০১২ এবং ইসলাম তথা ১৪৩৩ আরো কিছু অজানা তথ্য

ইসলাম যেখানে একঈশ্বর এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সত্যতাতে বিশ্বাস করতে হয় সেখানে বস্তুবাদ কিংবা ত্রিতত্ত্ববাদ (Trinity) কিংবা বহুঈশ্বরবাদ এর কোনো স্থান নেই | নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান |

আমি এখানে আগে মায়ান এবং বর্তমান সম্পর্কে কিছু বলব. তা না হলে ২০১২ নিয়ে স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যাবে না |

পৃথিবীতে বরফ যুগের ম্যামোথ থেকে শুরু করে ডাইনোসোর এরা প্রত্যেকেই ধ্বংস হয়েছে . পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয় এমনকি — আমরাও না .
২০১২ নিয়ে আমরা অনেকেই কমবেশ জানি | অনেকেই জানি সুপার হিট ফীল্ম 2012 এর কথা | কিন্তু এই ফীল্মও ২০১২ এর সতর্ক বাণী স্বরূপই তৈরী করা হয়েছিল যা কিনা পরে মুভী ইন্ড্রাস্ট্রিতে ফীল্ম হিসেবেই প্রকাশ পায় | 2012 এর তৈরির পিছনে মায়ান ক্যালেন্ডার এর ভূমিকা ছিল | মায়ান ক্যালেন্ডারে ২০১২ এর পর আর ২০১৩ আসে নি, তারা আবার ১, ২, ৩ এভাবে গুনে গিয়েছে | তারা ২০১২ এ বিশাল ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে যাতে কিনা সভ্যতার ধ্বংস হবে এবং নতুন সভ্যতার উত্থান হবে | অনেকেই বলেন ২০১২ তে নাকি পৃথিবী ধ্বংস হবে. এটা একটা ভুল ধারনা | ২০১২ তে যদি কিছু হয় তাহলে বড় রকমের বিপর্যয় হতে পারে (আল্লাহ ভালো জানেন) যার ফলে পৃথিবীর ৯০% মানুষই মারা যাবে . মায়ানরা যেটা দেখেছিল তা ছিল একটি গ্রহ | তারা দেখেছিল এই বিশাল গ্রহটি তাদেরকে আচ্ছাদিত করছে. এর তুমুল গ্র্যাভিটেশনাল ফোর্স এর প্রভাবে সুনামি আঘাত হানার ফলে ওদের সভ্যতা ধ্বংস হল | তাই তারা এই গ্রহটির নাম দিয়েছিল নিবিরু(Nibiru) বা ধ্বংসকারী. খুব ছোট অংকের মাধ্যমে তারা গ্রহের আসা যাওয়ার গণনা করতে পারত | ওরা এতটাই উন্নত ছিল যে ওরা জানত পৃথিবীর কক্ষপথ অনেকটা গোলাকার | তারা আরো জানত পৃথিবীর সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিন লাগে যা আমরা কয়েক শতক আগেও জানতাম না | ওদের মধ্যে যে কেউ ভবিষ্যত গণনা করতে পারত | স্বল্প সংখ্যক যারা বেচেছিল তারাই তাদের ভবিষ্যত গণনা করে বলেছিল এই নিবিরু আবার ২০১২ তে আসবে যার ফলে ভয়াবহ দুরঅবস্থার দেখা দিবে | অনেকে ধারনা করেন এই আদিম মায়ানরাই হল কুরআন এ বর্নিত নুহ নবীর উম্মত যাদেরকে আল্লাহ মহাপ্লাবন দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন | যাই হোক এ নিয়ে বলতে শুরু করলে সারা দিন লেগে যাবে.
এখন আধুনিক সভ্যতার প্লানেট এক্স আবিষ্কার এবং নাসা আমেরিকা ইউরোপ এর ষড়যন্ত্রের কথা বলব. প্ল্যানেট এক্স (নিবিরু) জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ১৯৮৩ এর গোড়ার দিকে সৌর সিস্টেম এর বাহির এর দিকে আবিষ্কার করে | ১৯৮৩ সালে নাসার ইরাস (IRAS-ইনফ্রা অ্যাস্ট্রোনমিকাল উপগ্রহ) সৌরজগত এর শেষ দিকে বৃহষ্পতি এর মত বড় কিছুর উপস্থিতির কথা বলে | যা ১৯৮৩ এর টাইমস পত্রিকায় উল্লেখ করা হয় |

লিংক : Click This Link

সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জোসেফ ব্র্যাডি আবিষ্কার করেন কোনো অপরিচিত গ্রহ (প্ল্যানেট এক্স) হ্যালির ধুমকেতুর কক্ষপথের মহাকর্ষিক সমস্যার কারণ | জোতির্বিজ্ঞানিদের গাণিতিক হিসাব এটা প্রমান করে যে, এই অপরিচিত গ্রহের ভর পৃথিবীর ৫ গুণ বেশি | এ সম্পর্কে মহাকাশ বিজ্ঞানী যেচারিয়া সিচিন (Zecharia Sitchin) এর একটি বক্তব্য না বললেই নয় ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, “আমাদের সৌরজগতে ৯টি গ্রহ নয় যা সর্বজন কর্তৃক গৃহীত বরং ১০ টি গ্রহ |”

এই বিশাল বস্তর কারণেই যে প্লুটো এর অরবিট পরিবর্তিত হয় এবং প্লুটো তার গ্রহের মর্যাদা হারায় পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা তা কোনো অজানা কারণে আংশিক প্রকাশ করেন | (বর্তমানে প্লুটোকে Kuiper belt এর অংশ বলা হয়) অনেকে একে বাদামী তারা বলেছেন অনেকে বলেছেন ব্যর্থ তারা | অনেকে বলেছেন ধুমকেতু | অনেকে বলেছেন ১০তম গ্রহ অনেকে ১২তম গ্রহ | তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এর ভর বৃহষ্পতির চেয়েও বেশী | এর অরবিটও অন্য ধরনের | এর এক অরবিট সম্পন্ন হয় প্রায় তিন হাজার ছয়শ বছর এ | যদি এর আমাদের আরো তিন হাজার ছয়শ বছর আগে নুহ (আঃ) এসে থাকেন তাহলে এর পরের বার পৃথিবী ভ্রমন অতি নিকটেই | আমি আবারো বলছি যে এটি এর আগেও কখনো পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষ করে নি এই বার আসলেও করবে না | এর তুমুল গ্র্যাভিটির কারণেই পৃথিবীর নর্থ পোল আর সাউথ পোল ঘুরে যাবে ফলে সুর্য পশ্চিম দিকে উঠবে যা ইসলাম আমাদের ১৪০০ বছর আগেই বলে দিয়েছে | এর ফলে পৃথিবীর ৯০% মানুষ মারা যাবে বলে ধারণা করা হয় (আল্লাহই ভালো জানেন) | নর্থ পোল সাউথ পোল ইতিমধ্যে সরতে শুরু করেছে | ২০০৪ সালে সূর্যে বেশ কয়েকটি সৌরকলঙ্ক(Dark Spot) সৃষ্টি হয় এর ফলে যে সৌরঝড় (Sun Storm) এবং যে পরিমাণ রেডিয়েশন হয়েছিল তা আমাদের ম্যাগনেটিক পোলগুলো সহ্য করতে পারে নি | আর ঐ দিন পৃথিবীর সুমাত্রাতে ৯.২ রিকটার স্কেলের ভয়াবহ ভূমিকম্পসহ ভয়াবহ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছিল, ঐ দিন ইন্দোনেশিয়াতে সুনামি হয়েছিল | এ থেকে বুঝা যায় সৌরকলঙ্কের সাথে পৃথিবীর ভূমিকম্পের সম্পর্ক রয়েছে | এই রেডিয়েশন আমাদের মাটির অভ্যন্তরের আন্দোলনকে সক্রিয় করে |

আসছে ২০১২ সবচেয়ে বেশি সৌরঝড় এর বছর |

এখন আমি আমেরিকার নাসার এবং ইউরোপ এর ষড়যন্ত্রের কথা বলব |

প্ল্যানেট এক্স আবিষ্কার এর পর নাসা ও ইসা(ESA- European Space Agency) প্রথমে নিবিরু এর সত্যিকারের ছবি প্রকাশ করলেও তারা এখন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ |
এখন গুগল স্কাই এ নিবিরু তথা প্ল্যানেট এক্স এর অবস্থান কালো অংশ দিয়ে ঢাকা| যে কেউ দেখলে বুঝবে এখানে কিছু ছিল যা তারা দেখতে দিচ্ছেনা | কেউ কি ভেবে দেখছেন ওরা কী লুকাতে চাচ্ছে ? ওরা এটা ভাবছে যে এটা জানালে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে কিন্তু ওরা না জানিয়ে আরো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে |

এখন আমেরিকা এবং বিভিন্ন এলাকার গোপন বাজেট এর কথা বলি | আমেরিকা তাদের অনেক নিরাপদ জায়গায় আন্ডারগ্রাউন্ড বেস (যার সংখ্যা আনুমানিক ভাবে ১৩২ এর চেয়েও বেশী) বানাচ্ছে | নিরাপদ এই কারণে বললাম কারণ এই সকল এলাকায় ভূমিকম্প বা যেকোনো দূর্যোগ মুক্ত বলে তাদের ধারনা | (কিন্তু এখন এসব এলাকাতেও ভূমিকম্প হতে পারে) যেটি একটি গোপন প্রযেক্ট | এমনকি আমেরিকান মানুষদেরও সেখানে প্রবেশাধিকার নেই | এর নাম হলো ডামবস প্রযেক্ট (D.U.M.Bs.- Deep Underground Military Bases)| এই বেস গুলোতে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার মজুদ রাখা সহ সেখানে বৈজ্ঞানিক ভাবে মাটির নিচে খাবার উত্পাদন করার ব্যবস্থা করেছে | এটি একটি সম্মিলিত প্রযেক্ট | বিভিন্ন উন্নত দেশ এর সাথে গোপন ভাবে যুক্ত | রাশিয়া-আমেরিকা চিরন্তন শত্রু হওয়া সত্ত্বেও ওরাও এটার সদস্য | সাথে আছে ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশ |
ওরাই বলেছে “আমরা আসন্ন মহাদূর্যোগ এ সবাইকে বাঁচাতে পারব না, আমরা শুধু তাদেরকেই বাঁচাব যাদেরকে আমাদের দরকার ” | এমনকি SPT(south pole telescope) এর সব উপাত্ত গোপন রাখা হয়েছে.

এখন আমি পবিত্র আল কুরআন এর গাণিতিক কোড টার্ম ১৪৩৩(২০১২) এর কথা বলব সাথে ইমাম মাহদি আসার কিছু হাদীস বলব |

১৪৩৩ পবিত্র কুরআন এর ম্যাথম্যাটিকাল কোড

পবিত্র কুরআন এর ম্যাথম্যাটিকাল কোডের কথা বলতে হলে আগে আমাদের প্রাইম নাম্বার সম্পর্কে জানতে হবে | সবাই জানেন প্রাইম নাম্বার কি | তাও বলি যে সকল নাম্বার 1 এবং ঐ নাম্বার ছারা আর কোনো নাম্বার দিয়ে ভাগ যায় না তাদেরকে প্রাইম নাম্বার বলে | যেমন : ১,২,৩,৫,৭,১১,১৩,১৭,১৯,২৩..​. লক্ষ্য করুন এই ডিফারেন্স কিন্তু অনিয়মিত | আবার এক বিশেষ ধরনের প্রাইম নাম্বার আছে যাকে অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার বলা হয় | অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার সেই সকল বিশেষ প্রাইম নাম্বার যেগুলোর সংখ্যামানের যোগফলও প্রাইম নাম্বার হয় |

একটা উদাহরন দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে যেমন : ১১ একটি অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার | (১+১=২ | ২ একটি প্রাইম নাম্বার) | আল্লাহ তা আলা কুরআনেও এই সব নাম্বার ব্যবহার করেছেন | পবিত্র কুরআনের শুরুর সূরা ফাতিহাতে ৭ টি আয়াত, ২৯ টি শব্দ, ১৩৯ টি বর্ণ আছে যার সবগুলিই অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার | এমনকি এগুলোকে বাম দিক থেকে বা ডান দিক থেকে যেকোনো দিক থেকে এদের পাশাপাসি বসালে তাও অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার হয় |
|||৭২৯১৩৯ বা ১৩৯২৯৭ ||| ৭+২+৯+১+৩+৯=31 |||

পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে অ্যাডিটিভ প্রাইম নাম্বার এর কথা বলা হয়েছে |

এখন আমি ২০১২ তে আসি :

পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রহমান এ ৩১ বার বিভিন্ন আয়াতে “ফাবিআয়্যি আলা ইরাব্বিকু মা তুকাজ্জিবান” বলা হয়েছে | যার অর্থ “তোমরা (জ্বীন ও মানব জাতি) তোমার প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে”
১৩, ১৬, ১৮, ২১, ২৩, ২৫, ২৮, ৩০, ৩২, ৩৪, ৩৬, ৩৮, ৪০, ৪২,৪৫, ৪৭, ৪৯, ৫১, ৫৩, ৫৫, ৫৭, ৫৯, ৬১, ৬৩, ৬৫, ৬৭, ৬৯, ৭১, ৭৩, ৭৫, ৭৭

এখন এসকল আয়াতসমূহ যোগ করা হলে যা পাওয়া যায় তা হল 1433 |
১৩+ ১৬ + ১৮ + ২১ + ২৩ + ২৫ + ২৮ + ৩০ + ৩২ + ৩৪ + ৩৬ + ৩৮ + ৪০ + ৪২ + ৪৫ + ৪৭ + ৪৯ + ৫১ + ৫৩ + ৫৫ + ৫৭ +৫৯ + ৬১ + ৬৩ +৬৫ + ৬৭ + ৬৯ + ৭১ + ৭৩ + ৭৫ + ৭৭ = ১৪৩৩

এখন লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন ১৪৩৩ একটি প্রাইম নাম্বার এমনকি এর যোগফলও প্রাইম নাম্বার (১+৪+৩+৩=১১) |

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সূরা আর রহমানের শব্দ সংখ্যা ৩৫৫ | এর মাধ্যমে একে বারে আগামী বছর চিহ্নিত হচ্ছে কারণ ১৪৩৩ হল লিপ ইয়ার | আর হিজরী লিপ ইয়ার হয় ৩৫৫ দিন এ |
আরো আশ্চর্যের বিষয় হল পবিত্র কুরআনের ১৪৩৩ নাম্বার আয়াত বর্ণ গুনে গুনে এমনকি শব্দ গুনে গুনে দেখলেও প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আযাব এবং শাস্তির কথা লক্ষ্য করা যায় |
১৪৩৩ তম আয়াত হল পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুস এর ৬৯ নং আয়াত |

সূরা ইউনুস (১০-৬৯)“বলে দাও, যারা এরূপ করে তারা অব্যাহতি পায় না।“
আবার বর্ণ গুনে গুনে ১৪৩৩তম হয় সূরা বাকারাঃ(২:৮৬)
“এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। অতএব এদের শাস্তি লঘু হবে না এবং এরা সাহায্যও পাবে না”।
আবার শব্দ গুনে গুনে ১৪৩৩ তম হয় সূরা বাকারাঃ(২:২৪)

“আর যদি তা না পার-অবশ্য তা তোমরা কখনও পারবে না, তাহলে সে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে অবিশ্বাসীদের জন্য” |
এখন গোলাকার এই পৃথিবীকে ৩৬০˚ দ্রাঘিমাংশ (উল্লম্ব অর্ধবৃত্ত) এবং ১৮০˚ অক্ষাংশে (অনুভূমিক পূর্ণবৃত্ত) ভাগ করা যায় | আবারও সৃষ্টিকর্তা সূরা আর রহমানে ৩১ বার বর্নিত আয়াতের মাধ্যমে এর কথা বলছেন যার পরিসর ০˚ থেকে ৯০˚ এর মধ্যে |

১৩˚ ১৬˚ ১৮˚ ২১˚ ২৩˚ ২৫˚ ২৮˚ ৩০˚ ৩২˚ ৩৪˚ ৩৬˚ ৩৮˚ ৪০˚ ৪২˚ ৪৫˚ ৪৭˚ ৪৯˚ ৫১˚ ৫৩˚ ৫৫˚ ৫৭˚ ৫৯˚ ৬১˚ ৬৩˚ ৬৫˚ ৬৭˚ ৬৯˚ ৭১˚ ৭৩˚ ৭৫˚ ৭৭˚ এখন এই বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়া আয়াতসমূহ দুই ধরনের অস্তিত্বশীল বস্তুর (মানুষ ও জ্বিন) কথা বলে তাই এই ল্যাটিটিউড নাম্বারগুলো যদি উত্তরাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় উভয় গোলার্ধের জন্য প্রয়োগ করা হয়, (১৩ নর্থ ১৩ সাউথ এভাবে পৃথিবীর মানচিত্রে বসানো হলে) তাহলে তা পবিত্র ভূমি মক্কা, জেরুজালেম, মদীনা, ছাড়া পৃথিবীর সব ঘনবসতিপূর্ণ প্রায় ৯০০০০ এলাকাকে চিহ্ণিত করে | তবে একটা জিনিস লক্ষ রাখতে হবে তা হল কুরআনুযায়ী পৃথিবীর কেন্দ্র মক্কা যা বিজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত | তাই এক্ষেত্রে আমাদের মক্কাকে কেন্দ্র ধরে হিসাব করতে হবে |

হাদীসে ২০১২ এবং ঈমাম মাহদি সম্পর্কে আসি :

এ বিষয়ে অনেকেই একমত যে ইমাম মাহদির জম্ম হয়ে গিয়েছে | হাদীসে ঈমাম মাহদি আসার আলামত হিসেবে পৃথিবীর চরম বিপর্যয়, দুর্ভোগ এবং মহাদুর্যোগের কথার উল্লেখ আছে |
সব হাদীস না বলে আমি কয়েকটা হাদীস বলব |

“পৃথিবী ততক্ষন পর্যন্ত এর পরিঃশেষ হবে না যতক্ষন পর্যন্ত না আমার পরিবার (বংশ) থেকে একজনের আবির্ভাব হবে এবং সারা পৃথিবীতে ন্যায়ের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে ” |
ইমাম মাহদির আগমনের আরেকটি লক্ষন হলো দুইশিংযুক্ত একটি তারার (আপনি চাইলে একে প্লানেট এক্স বলতে পারেন) আগমন যার লম্বা লেজ থাকবে এবং সারা আকাশকে আলোকিত করবে এর কারণে উপকূলবর্তী স্থানসমূহ ডুবে যাবে |
ঘনঘন ভূমিকম্প হবে |
মহানবী (সঃ) আরো বলেন,
“তোমরা ততক্ষন পর্যন্ত ইমাম মাহদিকে দেখতে পাবে না যতক্ষন পর্যন্ত না ১৫ রমজান শুক্রবার পৃথিবীর পূর্ব, পশ্চিম এবং অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলাতে তিনটি ভয়াবহ ভূমিধ্বস হবে যা কোনো চোখ এ পর্যন্ত দেখে নি” |
তারপর আয়েশা (রঃ) জিজ্ঞেস করলেন “যদিও পৃথিবীতে কিছু ভালো মানুষ থাকবে তাও কি এ ঘটবে?”
মহনবী (সঃ) বললেন, “যখন খারাপের সংখ্যাই বেশি হবে এবং পৃথিবীতে অন্যায় অবিচার বেড়ে যাবে এবং বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে |”
এই ভূমিধ্বস ঐ স্থানের সকলকে গিলে ফেলবে |

http://​www.islamicfinder.org/​dateConversion.php এই সাইটে গিয়ে ১৫ রমজান ১৪৩৩ লিখে দেখুন তাহলে ইংরেজী সণে যে তারিখ পাওয়া যায় তা হল ৩ আগস্ট ২০১২ শুক্রবার | আল্লাহই ভালো জানেন কি হবে না হবে তবে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত |

ইমাম মাহদি আসার আরো লক্ষন হলো বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দেখা দিবে এক জায়গায় বিদ্রোহ হতেই অন্য স্থানে বাতাসের গতিতে তা ছড়িয়ে পড়বে | রমজান মাসে ২ টি গ্রহন হবে যদিও এই লক্ষনটি পূর্ণ হয়ে গিয়েছে হিজরী ১৪০২ সণে |ইরাক-ইরান যুদ্ধ ইমাম মাহদি আসার লক্ষন | দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে | সোমালিয়া সহ আরো কয়েকটি দেশে ১.৫ কোটিরও অধিক মানুষ দুর্ভিক্ষ কবলিত |
জেরুজালেম ইহুদিদের দখলে চলে যাবে, মানুষ মিথ্যা কথাকে সুদ গ্রহনকে সকল ধরনের গানবাজনাকে হালাল বলে মনে করবে, অযোগ্য ও অসত্ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপ্রধান হবে , দেশে দেশে বিদ্রোহ দেখা দিবে, সত্য বিলুপ্ত হবে, ধর্মপ্রচার করা কঠিন হয়ে যাবে, ধর্মের কথা বললে মানুষ খারাপ বলে মনে করবে, দিন খুব দ্রুত যাবে বলে মনে হবে এগুলি সবই হলো ইমাম মাহদি আসার লক্ষন | এছাড়া আরো অনেক লক্ষন আছে যা বর্তমান যুগের সাথে মিলে | সিরিয়া, ইয়েমেনে যা হচ্ছে তাও ইমাম মাহদির আগমনের আলামত | হাদিসে বলা হয়েছে দাজ্জাল শাসন করবে ৪০ দিন. ১ম দিন ১ বছরের মত, ২য় দিন ১ মাসের মত আর ৩য় দিন ১ সপ্তাহের মত এবং বাকী ৩৭ দিন আমাদের স্বভাবিক দিনের মত. এখন সুরা হজ্জ এর ৪৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “ তোমার প্রতিপালকের ১ দিন তোমার ১ হাজার বছরের সমান |”

১ দিন = ১০০০/১বত্সর = ১০০০ বত্সর
১ দিন = ১০০০/১২মাস = ৮৩.৩৩ বত্সর
১ দিন = ১০০০/৫২সপ্তাহ = ১৯.২৩ বত্সর

এই হিসাব অনুযায়ী দাজ্জাল (AntiChrist) তার গোপন এবং প্রতারণাপূর্ণ সংগঠন শুরু করেছে তার অনুসারী ইহুদীদের মাধ্যমে বৃটেনে প্রায় ৯০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত. যা হল ১০০০ বছর. এইরুপে দাজ্জাল তার ১ম দিন শেষ করল. দাজ্জাল এভাবে ২য় দিনে এবং ১৯১৭ সালে অ্যামেরিকার কাছে এই সংগঠনের ক্ষমতা হস্তান্তর করল এবং সকল ধরনের কার্যক্রম চালু রাখল . ২০০১ সালের ৯/১১ পর্যন্ত যা ৮৩.৩৩ বছর. এভাবে দাজ্জাল তার ২য় দিন শেষ করল এবং তার ক্ষমতা ঈসরাইলের কাছে হস্তান্তর করল. সেই অনুযায়ী এখন চলছে দাজ্জালের ৩য় দিন যা শেষ হবে (২০০১+১৯)= ২০২০ সালে. এরপর আসবে সত্যিকার দাজ্জাল শারীরিক ভাবে যা আমাদের ৩৭ দিনের মত. আরেক হাদিসে বলা হয়েছে ইমাম মাহদি শাসন করবেন ৭ বত্সর. মহানবী (সঃ) বলেছেন, “বিশাল যুদ্ধ এবং ইস্তাম্বুল জয় এর মধ্যে ৬ বছর পূর্ণ হবে এবং দাজ্জাল এর আগমন ঘটবে সপ্তম বছরে.

অপর হাদিসে বলা হয়েছে ইমাম মাহদি শাসনের ৭ম বছরে দাজ্জালের আগমন হবে. সুতরাং ২০২০-৭=২০১৩. সেই অনুযায়ী ইমাম মাহদির আগমন ২০১৩ এ ঘটতে পারে. আল্লাহই ভালো জানেন. আর ইমাম মাহদির আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে মারাত্নক দুর্যোগ হবে তা ২০১২. আল্লাহই ভালো জানেন.
মহানবী (সঃ) বলেছেন, “সারা পৃথিবী ধোয়া দিয়ে আচ্ছন্ন না হওয়া পর্যন্ত সেই দিন (ইমাম মাহদির আগমনের দিন) আসবে না ”
ডিসকোভারির অ্যাপোকিলিপ্স আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বেশ কয়েকটি ডকুমেন্ট রয়েছে এ সম্বন্ধে . তাদের মতে লা পামার (La Palma) এই কুমব্রেভিয়েহা অথবা আমেরিকার ইয়েলোস্টোনের অগ্নুত্পাত হলে সারা আমেরিকা নিশ্চিহ্ন হবে এবং এর ফলে সারা পৃথিবী ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে. এমনকি মাসখানেক সূর্যও চোখে পড়বে না.
পাঠক চিন্তা করবেন না আরো কয়েকটা কথা বলে ইনশাল্লাহ শেষ করে ফেলব | ইসা (আঃ) তথা যিশু (Jesus) এর পুনঃআগমন এতে আমাদের প্রত্যেকেরই বিশ্বাস করতে হয় |

শুধু আমি একটাই হাদীস বলব সেটা হলো – ইসা (আঃ) (Jesus Christ) দাজ্জালকে (AntiChrist) ২টি তীর দিয়ে মারবেন গেইট অব লুত এ যা ইসরাইল এ অবস্থিত | আমাদের সমাজে এখন পারমানবিক বোমা থেকে শুরু করে কত ধরনের রাইফেল আছে তা সত্ত্বেও এই শক্তিশালি দাজ্জালকে (এন্টিখ্রিস্ট) কেন ২টি তীর দিয়েই মারা হবে ? এ থেকে বুঝা যায় আমাদের এই চরম উন্নত সভ্যতা আর থাকবে না, মানবের এই উন্নত সভ্যতার পতন ঘটবে এবং কুব কম সংখ্যকই টিকে থাকবে (আল্লাহই ভালো জানেন) |

এখনই সময় জীবনকে সুন্দর করে তোলার নতুবা এমন এক সময় আসবে যখন চাইলেও আর পারবেন না |

আমি কয়েকটা জিনিস স্পষ্ট করতে চাই

১. আমি কিন্তু ১০০ ভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারি না আগামী বছরই হবে, সর্বশক্তিমান আল্লাহই ভালো জানেন | নিশ্চই তিনি মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ |

২. আমরা কেউ কখনও এ কখনও এ কথা বলতে পারি না যে কেয়ামত অনেক দুরে কারন তা কুরআন বিরোধী | কেয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহর ছাড়া আর কারো নেই | কেয়ামত অনেক দুরে এই কথা বলা উচিত না কারন আল্লাহই কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, “কেয়ামত সন্নিকটে” (সূরা ক্বামার)
আল্লাহর অযাব সম্পর্কে এভাবেই সূরা মুলকের ১৬ থেকে ১৮ আয়াতে বলা হয়েছে-
তোমরা কি নিশ্চিত যে, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেবেন না, অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে না।
তোমরা কি নিশ্চিন্ত যে, আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন না, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী।
তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছিল, অতঃপর কত কঠোর হয়েছিল আমার অস্বীকৃতি।

৩. আর আবারও বলছি কেউ এটা কখনই ১০০% বিশ্বাস করবেন না. বিশ্বাস করবেন না যে এটা আগামি বছরই হবে. হ্যা তবে এটা হবেই ২০১২ তে না হলেও এসব ঘটার সময় সন্নিকটে. আর বারবার বলছি পৃথিবী ধ্বংস হবে না বড় দুর্যোগ হতে পারে (আল্লাহই ভালো জানেন) .

৪. আর কখনই বলবেন না কেয়ামত অনেক দুরে কারন মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “আমার জন্ম আর কেয়ামত হাতের মধ্যমা আর তর্জনি এই দুই আঙ্গুলের ব্যবধানের সমান | ” তাই আমাদের আগে থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত নতুবা পরে নিজেই পস্তাবেন |

৫. মহানবী (সঃ) বলেছেন – “ শেষ যুগে আমার কিছু উম্মত মদ, ব্যভিচার, ঘুষ, সুদ, মিথ্যা কথা বলা এগুলিকে হালাল বলে মনে করবে ” | এখনকার যুগে এর প্রত্যেকটি হচ্ছে |
আর আমরা হলাম সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত মানে আমরা শেষ যুগের মানুষ আমরা এটা কিভাবে ভুলে যাই ???

কেয়ামতের আলামত হল .মানুষ ঘরে বসেই দূরের খবর জানতে পারবে ।উচু ইমারত নির্মান করা হবে । মেয়েরা বেপর্দার সাথে ঘুরে বেড়াবে । সন্তান বাবা মায়ের অবাধ্য হবে । জিনা ব্যাভিচার বেড়ে যাবে । বর্তমানে এগুলো ব্যাপক হারে ঘটে যাচ্ছে । সুতরাং কেয়ামত সন্নিকটে । তাই আসুন আগে থেকেই সতর্ক হই । আল্লাহ ও রাসুলের (সাঃ) আনুগত্য করি ।

৬. আবারও বলছি আমি আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি না. এটা জেনে আপনি যদি নিজেকে সংশোধন করেন তাহলেই আমার সাফল্য. আমি এবং আমরা বন্ধু ইমাম মাহদির সাথে ১৪৩৩ তথা ২০১২ এর সম্পর্ক এই নিয়ে রিসার্চ করে নিজেদের পাল্টিয়েছি. এবার আপনার বদলানোর পালা নতুবা পরে অনেক দেরি হয়ে যাবে.

Posted in Uncategorized | Leave a comment

বুযুর্গানে কিরামের হাত-পা চুমু দেয়া ও পবিত্র বস্তুর সম্মান করা

পবিত্র বস্তুকে চুমু দেয়ার প্রমাণ
পবিত্র বস্তুকে চুমু দেয়া জায়েয। কুরআন করীম ইরশাদ ফরমান-

وَادْ خُلُوالْبَابَ سُجَّدًا وًّقُوُلُوُا حِطَّةٌ

অর্থাৎ ওহে বনী ঈসরাইল বায়তুল মুকাদ্দিসের দরজা দিয়ে নতশিরে প্রবেশ কর। এবং বল আমাদের গুনাহ মাফ করা হোক। এ আয়াত থেকে অবগত হওয়া গেল যে আম্বিয়া কিরামের আরামগাহ বায়তুল মুকাদ্দিসকে সম্মান করানো হলো অথর্ৎ বনী ঈসরাইলকে ওখানে নতশিরে প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ আয়াত দ্বারা এটাও বোঝা গেল যে পবিত্র স্থান সমূহে তওবা তাড়াতাড়ি কবুল হয়। মিশ্কাত শরীফের اَلْمُصَافَحَةِ وَالْمُعَانَقَةِ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে-

وَعَنْ ذِرَاعٍ وَّكَانَ فِىْ وَفْدِ عَبْدِ الْقَيْسِ قَالَ لَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِيْنَةَ فَجَعَلْنَا نَتَبَادَرُ مِنْ رَّوَاحِنَا فَنُقَبِّلُ يَدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرِجْلَه‘

হযরত যেরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যিনি আব্দুল কায়সের প্রতিনিধিভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন- যখন আমরা মদিনা মনোয়ারায় আসলাম তখন আমরা নিজ নিজ বাহন থেকে তাড়াতাড়ি অবতরণ করতে লাগলাম। অতঃপর আমরা হুযুর আলাইহিস সালামের পবিত্র হাত-পা চুমু দিয়েছিলাম।
মিশ্কাত শরীফের اَلْكَبَائِرُ وَعَلَامَاْتِ النِّفَاقِ শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত ছিফওয়ান ইবনে আস্সাল, থেকে বর্ণিত আছে فَتَقَبَّلَ يَدَيْهِ وَرِجْلَيْهِ (অতঃপর হুযুর আলাইহিস সালামের হাত-পায় চুমু দেন।) মিশ্কাত শরীফে مَا يُقَالَ عِنْدَ مَنْ حَضَرَهُ الْمَوْتِ শীর্ষক অধ্যায়ে তিরমিযী ও আবু দাউদ শরীফের বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে-

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَبَّلَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُثْمَانَ ابْنُ مَطْعُوْنٍ وَهُوَ مَيِّتٌ

অর্থাৎ হুযুর আলাইহিস সালাম হযরত উছমান ইবনে মাতউনকে মৃতবস্থায় চুমু দিয়েছেন। প্রসিদ্ধ শিফা শরীফে উলল্লেখিত আছে-

كَانَ اِبْنُ عُمَرَ يَضَعُ يَدَهْ عَلَى الْمِنْبَرِ الَّذِىْ يَجْلِسُ عَلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِى الْخُطْبَةِ ثُمَّ يَضَعُهَا عَلَى وَجْهِهِ

যে মিম্বরে দাঁড়িয়ে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুৎবা দিতেন, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর সেটাতে হাত লাগিয়ে মুখে মাখতেন (চুমু দিতেন) আল্লামা ইবনে হাজরের রচিত শরহে বুখারীর ষষ্ঠ পারায় ১১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছে-

اِسْتَنْبَطَ بَعْضُهُمْ مِنْ مَشْرُوْعِيَّةِ تَقْبِيْلِ الْاَرْكَانِ جَوَازَ تَقْبِيْلِ كُلِّ مَنْ يَّسْتَحِقُّ الْعَظْمَةَ مِْن اَدَمِىٍّ وَغَيْرِهِ نُقِلَ عَنِ الاِْمَامْ اَحْمَدَ اَنَّه‘ سُئِلَ عَنْ تَقْبِيْلِ مِنْبَرِ النَّبِىِّ عَلَيْهِ السَّلاَمَ وَتَقْبِيْلِ قَبْرِهِ فَلَمْ يَرَبِهِ بَاسًا وَّنُقِلَ عَنْ ِابْنِ اَبِى الصِّنْفِ اليَمَانِى اَحَدِ عُلَمَاءِ مَكَّةَ مِنَ الشَّافِعِيَّةِ جَوَازَ تَقْبِيْلِ الْمُصْحَفِ وَاَجْزَاءِ الْحَدِيْثِ وَقُبُوْرِ الصَّالِحِيْنَ مُلْخَصًا

অর্থাৎ কাবা শরীফের স্তম্ভগুলোর চুম্বন থেকে কতেক উলামায়ে কিরাম বুযুর্গাণে দ্বীন ও অন্যান্যদের পবিত্র বস্তুসমূহ চুম্বনের বৈধতা প্রমাণ করেন। ইমাম আহমদ ইব্নে হাম্বল (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে তার কাছে কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল- হুযূর আলাইহিস সাললামের মিম্বর বা পবিত্র কবর মুবারকে চুমু দেয়াটা কেমন? তিনি এর উত্তরে বলেছিলেন, কোন ক্ষতি নেই। মক্কা শরীফের শাফেঈ উলামায়ে কিরামের অন্যতম হযরত ইবনে আবিস সিন্ফ ইয়ামানী থেকে বর্ণিত আছে- কুরআন করীম ও হাদীছ শরীফের পাতাসমূহ এবং বুযুর্গানে দ্বীনের কবরসমূহ চুমু দেয়া জায়েয।

প্রখ্যাত ‘তুশেখ’ গ্রন্থে আল্লামা জালাল উদ্দিন সয়ুতী (রহঃ) বলেছেন-

اِسْتَنْبَطَ بَعْضُ الْعَارِفِيْنَ مِنْ تَقُبِيْلِ الْحَجَرِ الْاَسْوَدِ تَقْبِيْلَ قُبُورِ الصَّالِحِيْنَ

হাজর আসওয়াদের চুম্বন থেকে কতেক আরেফীন বুযুর্গানে কিরামের মাযারে চুমু দেয়ার বৈধতা প্রমাণ করেছেন।
উপরোক্ত হাদীছে, মুহাদ্দিছীন ও উলামায়ে কিরামের ইবারত থেকে প্রমাণিত হলো যে বুযুর্গানে দ্বীনের হাত, পা, ওনাদের পোশাক, জুতা, চুল মোট কথা সব কিছু পবিত্র বস্তু; অনুরূপ কাবা শরীফ, কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফের পাতা সমূহের উপর চুম্বন জায়েয ও বরকতময়। এমনকি বুযুর্গানে দ্বীনের চুল, পোশাক ও অন্যান্য পবিত্র বস্তুর সম্মান করা এবং যুদ্ধকালীন ও অন্যান্য মুসিবতের সময় এগুলো থেকে সাহায্য লাভ করা কুরআন করীম থেকে প্রমাণিত আছে। কুরআন করীম ইরশাদ ফরমান-

وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ اِنَّ اَيَةَ مُلْكِهِ اَنْ يَّاْتِيَكُمُ التَّابُوْتُ فِيْهِ سَكِيْنَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِّمَّا تَرَكَ اَلُ مُوْسَى وَاَلُ هَرُوْنَ تَحْمِلُهُ اَلْمَلَئِكَةُ

(বনী ইসরাঈলীদেরকে তাদের নবী বলেছেন, তালুতের বাদশাহীর নিদর্শন হচ্ছে তোমাদের কাছে সেই তাবুত (সিন্দুক) আসবে যেথায় তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে চিত্ত প্রশান্তি এবং হযরত মুসা ও হযরত হারুনের পবিত্র বস্তু সমূহ থাকবে; ফিরিশতাগণ এটা বহন করে আনবে।) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তফসীরে খাযেন, রূহুল বয়ান, মদারেক, জালালাইন ও অন্যান্য তফসীরে লিখা হয়েছে যে তাবুত হচ্ছে সীসা ও কাঠের তৈরী সিন্দুক, যেখানে নবীগণের ফটো (এ সব ফটো কোন মানুষের তৈরী ছিল না বরং কুদরতী ছিল) ওনাদের আবাসসমূহের নকশা, হযরত মুসা (আঃ) এর লাঠি, তাঁর কাপড়, জুতা এবং হযরত হারুন (আঃ) এর লাঠি, টুপি ইত্যাদি ছিল। বনী ইসরাঈলগণ যখন শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো, তখন বরকতের জন্য ওটাকে সামনে রাখতো এবং যখন খোদার কাছে দুআ করতো, তখন ওটাকে সামনে রেখেই প্রার্থনা করতো। সুতরাং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে বুযুর্গানে দ্বীনের পবিত্র বস্তু থেকে ফয়েয গ্রহণ এবং ওগুলোকে সম্মান করা নবীগণেরই অনুসৃত পথ। তফসীরে খাযেন, মদারেক, রূহুল বয়ান ও কবীরে বার পারার সূরা ইউসুফের আয়াত فَلَمَّا ذَهَبُوْا بِهِ এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তার ভাইদের সাথে পাঠালেন, তখন ওরা গলায় হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কোর্তাকে তাবিজ বানিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে নিরাপদে থাকে। পৃথিবীর সমস্ত পানি আল্ললাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু যমযম কূপের পানির সম্মান এ জন্যেই করা হয় যে এটা হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর পবিত্র পায়ের আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে। মকামে ইব্রাহীমের পাথর ইব্রাহীম (আঃ) এর সানি্নধ্যের ফলে এর ইয্যত এতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে যে আল্ললাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান- وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ اِِبْرَاهِيْمَ مُصَلَّى (তোমরা ইব্রাহীম (আঃ) এর দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর।) অর্থাৎ সবার মস্তক ওই দিকে নত কর। মক্কা শরীফকে যখন হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সম্পর্কিত করা হলো, তখন আলল্লাহ তাআলা এর নামের কসম করে ইরশাদ ফরমান-

لاَاُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ وَاَنْتَ حِلٌّ بِهَذَا الْبَلَدِ

(শপথ করছি এ শহরের (মক্কা শরীফের) আর তুমি এ শহরের অধিবাসী) অন্যত্র বলেছেন وَهَذَا الْبَلَدِ الْاَمِيْنِ (এবং এ নিরাপদ শহরের (মক্কা) শপথ)। হযরত আয়ুব (আঃ) প্রসঙ্গে ইরশাদ ফরমান- اُرْكُضْ بِرِجْلِكَ هَذَاْ مُغْتَسَلٌ بَارِدٌ وَتُرَابٌ
(তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিকে আঘাত কর। এ-তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়।) অর্থাৎ হযরত আয়ুব (আঃ) এর পায়ের আঘাতে যে পানি বের হলো, সেটা রোগ নিরাময়ের সহায়ক হলো। এতে বোঝা গেল নবীদের পা ধোয়া পানি মর্যাদাবান ও রোগ নিরাময়ের সহায়ক। মিশ্কাত শরীফের শুরুতে কিতাবুল লেবাসে বর্ণিত আছে যে হযরত আস্মা বিনতে আবু বকর (রাঃ) এর কাছে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আচকান শরীফ ছিল এবং মদীনা শরীফে কারো রোগ হলে, তিনি ওটা ধুয়ে তাকে সেই পানি পান করাতেন। সেই মিশ্কাত শরীফের কিতাবুল আত্-আমার اَلاشْرِبَةْ শীর্ষক অধ্যায়ে উলেল্লখিত আছে যে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা হযরত কব্শা (রাঃ) এর বাসায় তশরীফ নিয়ে গেলেন এবং ওর মোশকে মুখ মুবারক লাগিয়ে পানিপান করেন। তিনি (কব্শা) মোশকের মুখটা বরকতের জন্য কেটে রেখে দিয়েছিলেন। একই মিশ্কাতের কিতাবুস সালাতের اَلْمَسَاجِدْ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে যে একদল লোক হুযূর (সাল্ললাল্ললাহু আলাইহি ওয়া সাল্ললামের (হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আরয করেন- আমাদের দেশে ইহুদীদের একটি উপাসনালয় আছে; আমরা একে ভেঙ্গে মসজিদ করার ইচ্ছে পোষণ করি। তখন হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি থালায় পানি নিয়ে ওখানে কুলি করেন এবং বলেন ওই উপাসনালয়কে ভেঙ্গে ফেল। অতঃপর এ পানি ওখানে ছিটিয়ে দাও। তারপর মসজিদ তৈরী কর। এতে বোঝা গেল হুযূর (সালল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম) পবিত্র থুথু কুফরীল অপবিত্রতা দূরীভূত করেন। হযরত খালিদ বিন ওলীদ (রাঃ) স্বীয় টুপীতে হুযূর (সালল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম) এর একটি চুল মুবারক রাখতেন এবং যুদ্ধের সময় ওই টুপী নিশ্চয় তার মাথায় থাকতো। মিশ্কাত শরীফে السترةঅধ্যায়ে বর্ণিত আছে, হুযূর (সালল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সালল্লাম) ওযু ফরমালেন, তখন হযরত বিলাল (রাঃ) হুযুরের ব্যবহৃত ওযুর পানি নিয়ে নিলেন। লোকেরা হযরত বিলালের দিকে দৌড়ে গেলেন এবং যিনি ওই পানিতে হাত ভিজাতে পারলেন, তিনি সে হাত নিজ মুখে মালিশ করে নিলেন। আর যিনি পেলেন না, তিনি অন্যজনের হাতের আদ্রতা নিজ মুখে বুলিয়ে নিলেন। এ সব হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বুযুর্গানে দ্বীনের ব্যবহৃত বস্তুসমূহ থেকে বরকত লাভ করা সাহাবা কিরামের সুন্নাত। এবার ফকীহগণের বিভিন্ন উক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। ফাত্ওয়ায়ে আলমগীরী কিতাবুল কারাহিয়া مُلَاقَاتُ الْمُلُوْكِ শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

اِنْ قَبَّلَ يَدَ عَالِمِ اَوْ سُلْطَانٍ عَّادِلٍ بِعِلْمِهِ وَعَدْلِهِ لَا بَاسَ بِهِ

যদি আলিম বা ন্যায়পরায়ণ বাদশাহের হাতে চুমু দেয়া হয় ওদের ইলম ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে, তাহলে এতে কোন ক্ষতি নেই। একই গ্রন্থে কিতাবুল কারাহিয়াতে زِيَارَةُ الْقُبُوْرِ অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে-

وَلَاْبَاسَ بِتَقُبِيْلِ قَبْرِ وَالِدَيْهِ كَذَا فِى الْغَرَائِبِ

নিজের মা-বাপের কবরে চুমু দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই যেমন গরায়েবে বর্ণিত হয়েছে। সেই আলমগীরীর কিতাবুল কারাহিয়াতের مَلَاقَاتِ الْمُلُوْكِ অধ্যায়ে আরও লিপিবদ্ধ আছে-

اِنَّ التَّقْبِيْلَ عَلَى خَمْسَةِ اَوْجَهٍ قُبَلَةُ الرَّحْمَةِ كَقُبْلَةِ الْوَالِدِ وَلَدَهُ وَقُبْلَةُ التَّحِيَّةِ كَقُبْلَةِ الْمُؤْمِنِيْنَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ وَقُبْلَةُ الشَّفَقَةَ كَقُبْلَةِ الْوَلَدِ لِوَالِدَيْهِ وَقُبْلَةُ الْمَوَدَّةِ كَقُبْلَةِ الرَّجُلِ اَخَاهُ وَقُبْلَةُ الشَّهْوَةِ كَقُبْلَةِ الرَّجُلِ اِمْرَأَتَهُ وَزَادَ بَعْضُهُمْ قُبْلَةَ الدِّيَانَةِ وَهِىَ قُبْلَةُ الْحَجْرِ الْاَسْوَدِ

চুম্বন পাঁচ প্রকার-

আশীর্বাদসূচক চুম্বন, যেমন বাবা ছেলেকে চুমু দেয়; সাক্ষাৎকারের চুম্বন, যেমন কতেক মুসলমান কতেক মুসলমানকে চুমু দেয়; স্নেহের চুম্বন, যেমন ছেলে মা-বাবাকে দেয়; বন্ধুত্বের চুম্বন, যেমন এক বন্ধু অপর বন্ধুকে চুমু দেয়; কামভাবের চুম্বন, যেমন স্বামী স্ত্রীকে দেয়। কেউ কেউ ধার্মিকতার চুম্বন অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদের চুম্বনকে এর সাথে যোগ করেছেন।

দুররুল মুখতারের পঞ্চম খন্ড কিতাবুল কারাহিয়াতের শেষ অধ্যায় الاستبراء এর মুসাফাহা পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে وَلَا بَاسَ بِتَقْبِيْلِ يَدِا الْعَالِمِ وَالسُّلْطَنِ الْعَادِلِ আলিম ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহের হাতে চুমু দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই। এ জায়গায় ফাত্ওয়ায়ে শামীতে হাকিমের একটি হাদীছ উদ্ধৃত করেছে, যার শেষাংশে বর্ণিত আছে-

قَال ثُمَّ اَذِنَ لَه‘ فَقَبَّلَ رَأْسَه‘ وَرِجْلَيْهِ وَقَالَ لَوْ كُانْتُ اَمِرًا اَحَدًا اَنْ تَسْجُدَ لَاحَدٍ لَاَمَرْتُ الْمَرْ أَةَ اَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَقَالَ صَحِيْحُ الْاَسْنَادِ

হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই ব্যক্তিকে অনুমতি দিয়েছেন। তাই সে তাঁর মস্তক ও পা মুবারক চুমু দিলেন। অতঃপর হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান যদি আমি কাউকে সিজ্দার হুকুম দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে হুকুম দিতাম স্বামীকে সিজ্দা করতে। দুররুল মুখতারে সেই জায়গায় আলমগীরীর মত পাঁচ প্রকার চুম্বনের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে নিম্ন লিখিত বক্তব্যটুকু বর্ধিত করেছেন-

قُبْلَةُ الدِّيَانَةِ لِلْحَجْرِ الْاَسْوَدِ وَتَقْبِيْلُ عُتْبَةِ الْكَعْبَةِ وَتَقْبِيْلُ الْمُصْحَفِ قِيْلَ بِدْعَةِ لَكِنْ رُوِىَ عَنْ عُمَرَ اَنَّه‘ كَانَ يَاْخُذُ الْمُصُحَفِ كُلَّ غَدَاةٍ وَّيْقَبِّلُهْ وَاَمَّا تَقْبِيْلُ الْخَبْزِ فَجَوَّزَ الشَّافِعِيَّةُ اَنَّه‘ بِدْعَةٌ مُّبَاحَةٌ وَّقِيْلَ حَسَنَةٌ مُّلَخَّصًا

অর্থাৎ দ্বীনদারীর এক প্রকার চুম্বন রয়েছে, সেটা হচ্ছে হাজর আসওয়াদে চুম্বন ও কাবা শরীফের চৌকাঠে চুম্বন। কুরআন পাককে চুমু দেয়াটা কতেক লোক বিদ্আত বলেছেন। কিন্তু হযরত উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রতিদিন সকালে কুরআনে পাক হাতে নিয়ে চুমু খেতেন এবং রুটি চুমু দিয়াকে শাফেঈ মাযাহাবের লোকেরা জায়েয বলেছেন। কেননা এটা বিদ্আতে জায়েয। অনেকে এটাকে বিদ্আতে হাসানা বলেছেন। অধিকন্তু আল্ললাহ ইরশাদ ফরমান-

وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ اِبْرَاهِيْمَ مُصَلَّى

(তোমরা মকামে ইব্রাহীমকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর) মকামে ইব্রাহীম ওই পাথরকে বলে যেটার উপর দাঁড়িয়ে হযরত খলীল (আঃ) কাবা শরীফ তৈরী করেছেন। তার পবিত্র কদমের বরকতে সেই পাথরের এ মর্যাদা লাভ হলো- সারা দুনিয়ার হাজীরা ওই দিকে মাথানত করে। এ সব ইবারত থেকে প্রতীয়মান হলো- চুম্বন কয়েক প্রকারের আছে এবং পবিত্র বস্তুকে চুমু দেয়াটা দ্বীনদারীর আলামত। এ পর্যন্ত সমর্থনকারীদের উক্তি সমূহ উলল্লেখিত হলো। এবার বিরোধিতাকারীদের নেতা জনাব রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী কি বলেন, দেখুন। তিনি তার রচিত ফাত্ওয়ায়ে রশীদিয়ার প্রথম খন্ড كتات الخطر والاباحة এর ৫৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন- দ্বীনদার ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো জায়েয এবং এ রকম ব্যক্তির পায়ে চুমু দেয়াও জায়েয, যা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।” ইতি রশীদ আহমদ। এ প্রসঙ্গে আরও অনেক হাদীছ ও ফকীহ ইবারত পেশ করা যায়। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট মনে করি। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

http://madina24.com/bangla/%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%AA/#more-624

Posted in উপদেশ ও বানী চিরন্তন | Leave a comment

ধ্যান ॥ আল্লাহকে উপলব্ধি করার পথঃ

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। হামদর্দ ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্যরা নিজেকে জানার বা আত্ম উপলব্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আসলে নিজেকে বোঝার চেষ্টাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে- যদি স্রষ্টাকে চিনতে চাও তবে আগে নিজেকে চেনো। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, মানুষ আমার রহস্য। আমি মানুষের রহস্য। এ রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যেই মানুষের সৃষ্টি।

মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সকল সৃষ্টির ওপর আধিপত্য দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, বানিয়েছেন তার প্রতিনিধি। একমাত্র মানুষকেই তিনি দিয়েছেন সেই জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধা যা দিয়ে সে আল্লাহর অসীম সৃষ্টিশীলতা ও কুশলতাকে অনুধাবন করতে পারে। মানুষকে তিনি কত গুরুত্ব দিয়েছেন তা বোঝা যায় এভাবে যে, প্রথম নাযিলকৃত আয়াতে মানুষের জন্মরহস্যকেই তিনি তুলে ধরেছেন- ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে জমাটবদ্ধ রক্তপিণ্ড থেকে’। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোরআন নাযিলের ৯০০ বছর পর ১৬৭৭ সালে মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর স্পার্ম সেল নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরাও একই তথ্য দিলেন।

মানুষ যে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তা তিনটি মাপকাঠি দিয়ে আমরা বোঝার চেষ্টা করতে পারি। স্থান, গতি এবং বিশেষ বিবেক।

স্থানের মাপকাঠিতে অন্যান্য সৃষ্টিবস্তুর তুলনায় মানুষ যথেষ্ট ক্ষুদ্র একটি অস্তিত্ব। সাড়ে ৩ হাতের মানুষকে ২৫ হাজার মাইলের পৃথিবীর তুলনায় একটি বালিকণাই বলা যায়। আর সে যখন পৃথিবীরও ১৩ লক্ষ গুণ বড় সূর্যের তুলনায় দাঁড়ায় তখন কী হয় তা বলাই বাহুল্য। এটা তো বাহ্যিক। কিন্তু মানুষের অন্তর্গত স্থানের কি কোনো সীমাবদ্ধতা আছে? মানুষের ব্রেনে নিউরোন সেল রয়েছে ১০০ বিলিয়ন। যদি চোখ বন্ধ করে চিন্তা করি তাহলে এক সূর্য তো বটেই এরকম হাজার-কোটি সূর্যের ধারক গ্যালাক্সিকে আমার ভেতরে নিতে কোনো অসুবিধা হয়? হয় না। এটাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব।

দ্বিতীয় হলো- গতি। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আছে মন নামের এক রহস্যময় অস্তিত্ব। মনের গতিকে কি আলোর গতি বা অন্য কোনো মাপক দিয়ে পরিমাপ করা যায়? আলোর গতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। মনের গতি কি এর চেয়েও বেশি নয়?

তৃতীয় হলো- বিশেষ বিবেক। সাধারণ সচেতনতা আল্লাহ সবাইকেই দিয়েছেন। একটা পিঁপড়াও জানে কোথায় ঘর করলে ডিম নিরাপদ থাকবে। সাইবেরিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে শীতের পাখি যেমন বাংলাদেশে আসে তেমনি আবার ঠিক ঠিক চিনে ফিরেও যায়। মানুষকে আল্লাহ এই সাধারণ বিবেক যেমন দিয়েছেন, তেমনি দিয়েছেন বিশেষ বিবেক- মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রজন্মান্তরে যে জ্ঞান সঞ্চারিত হয়ে আসছে।

আর যদি কুশলতার কথা বলি তাহলে যেকোনো সৃষ্টির চেয়ে বিস্ময়কর বোধ হবে মানুষের সৃষ্টি। মানুষের ডিএনএ-তে তিনশ কোটি কোড রয়েছে। মাতৃগর্ভে যখন ভ্রূণের সঞ্চার হয় তখনই স্থির হয়ে যায় কোন জিন শরীরের কোন অংশটি তৈরি করবে। এমনকি তা নাকের সূক্ষ্ম লোম থেকে শুরু করে মুখের দাড়ি পর্যন্ত।

আল্লাহর সৃষ্টির এ পরিকল্পনা ও আর্কিটেকচারাল কনসেপ্ট- এটা এত নিখুঁত ও রহস্যময় যে, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে আমি কে, কেন এসেছি, সৃষ্টিজগতে আমার অবস্থান কোথায়- এই আত্মজ্ঞানই হওয়া উচিত মানুষের সকল জ্ঞান, সকল শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। আর ধ্যান বা আত্মমগ্নতা এই আত্মজ্ঞান লাভেরই মোক্ষপথ। পবিত্র কোরআনে এ ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে আসমান জমিন এবং দিবারাত্রি পরিবর্তনের মধ্যে আমি চিন্তাশীলদের জন্যে রেখেছি নিদর্শন।

জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত ঘটনা হলো মৃত্যু। কিন্তু সময়টা অনিশ্চিত। অলি-বুজুর্গ, সাধক যারা এ বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেন তারা বলেন, দমে দমে আল্লাহ আল্লাহ কর। কারণ দম যতক্ষণ আছে ততক্ষণই জীবন। যেমন, কেউ কোমায় আছে, কথা বলতে পারে না, খেতে পারে না, কাউকে চেনে না। বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে কৃত্রিম যন্ত্রপাতি দিয়ে। তারপরও কিন্তু কেউ বলবে না লোকটা মারা গেছে। কারণ তার এখনও দম আছে। এই দম আমরা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার বার নিই, ছাড়ি। একবার দম নিয়ে যদি তার পরেরবার ছাড়তে না পারতাম তাহলে সেটাই কিন্তু হতো আমার মৃত্যু মুহূর্ত। তার মানে প্রতি মুহূর্তেই আমার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। বলা উচিত- শোকর আলহামদুলিল্লাহ। যে হই না কেন স্রষ্টার প্রতি ধন্যবাদ জানানোর বিকল্প কিছু হতে পারে না। কারণ আলো বাতাস পানিসহ চারপাশের সমস্ত পরিবেশটা বিবেচনা করলে আমরা প্রতি মুহূর্তেই স্রষ্টার আশীর্বাদপুষ্ট।

এ শুকরিয়া, এ স্মরণ এবং এ উপলব্ধির জন্যে প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি, প্রয়োজন ধ্যান। ব্যায়াম করলে একজন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারেন। কিন্তু সুষম মানসিক গঠন ও বিকাশে প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। এ প্রস্তুতি বা ধ্যানের মাধ্যমেই মানুষ লাভ করে ইলমে তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান।

নবীজী (স) হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান করেছেন। একসময় আল্লাহ তাঁকে যথাযথ সত্য অবহিত করেছেন। তবে ধ্যানকে কার্যকরী ও ফলপ্রসূ করার জন্যে আল্লাহ কিছু খুঁটি ঠিক করে দিয়েছেন যাতে আমরা দিকভ্রান্ত না হই বা ছিটকে না পড়ি। কলেমা নামাজ যাকাত রোজা হজ- ইসলামের এ ফরজগুলোই সেই খুঁটি।

সূরা আর রহমানে আল্লাহ বলছেন, হে জ্বীন ও মানুষ, তোমরা অসীমে যেতে পারবে। কিন্তু পারবে না আমার আয়ত্তের বাইরে যেতে। ধ্যানের মাধ্যমে আমরা এই অসীমেই যেতে পারি। ধ্যানে আমি যখন আল্লাহকে চিন্তা করবো তখন সূর্যের ভেতর দিয়ে চলে গেলেও এর হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের তাপ শরীরে লাগে না। মনের গতিকে কোনো ছাদ, কোনো দেয়াল, কোনো হিমালয়ই আটকে রাখতে পারে না। ধ্যানের মধ্য দিয়েই আল্লাহ প্রদত্ত এই অসীম শক্তি উপলব্ধ সত্যে পরিণত হয় মানবমনে।

সূত্রঃ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

http://sonarbangladesh.com/blog/masudur_/67007

Posted in দর্শণ | 1 Comment

মনসুর হাল্লাজের ফিরে আসা

জাভেদ হুসেন

সুফি সাহিত্য, দর্শনে প্রেমে শহীদ হওয়ার আদর্শ হচ্ছেন মনসুর আল হাল্লাজ। হাল্লাজ পরবর্তী সুফি সাহিত্যে তিনি সেই প্রেমিক যিনি মানুষ ও পরম সত্যের মিলনের রহস্য প্রকাশ করেছেন। খাজা মীর দর্দ, মীর তকি মীর, মীর্জা গালিব থেকে শুরু করে অধুনা মোহাম্মদ ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজসহ অসংখ্য কবি হাল্লাজের এই বাঁধভাঙা মানবীয় প্রেম-দর্শনে মগ্ন হয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন কবিতা, ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন হাল্লাজের ভাবনাকে। হাল্লাজ সুফিদর্শনে প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, গতিশীল প্রেমই সৃষ্টির রহস্য- এই প্রেমই পরম সত্যের সারমর্ম। পরবর্তী সময়ে হাল্লাজের শিক্ষাকে সর্বেশ্বরবাদী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও আদতে তিনি তা নন। তিনি বরং মানুষের বর্তমান বাস্তবতার কাঠামোগত উত্তরণের কথা বলেছেন। তাঁর ভাবনায় কদাচিৎ পরম সত্য নিজ আর মানুষের মাঝের পর্দা সরিয়ে অনাদি, অসৃষ্ট মরম প্রেমিকের সৃষ্ট মরমে অবতরণ করে। বিংশ শতকে এসে হাল্লাজকে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা পালন করেছেন লুই মেসিনিউ। ১৯২৬ থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলামের সমাজবিদ্যার অধ্যাপক লুই ম্যাসিনিউ ৩২ বছর নিরলস শ্রম দিয়ে গেছেন হাল্লাজের ইতিহাস পুনর্গঠনের কাজে। হাল্লাজের জীবনের প্রতিটি টুকরো বিস্মৃত ইতিহাস থেকে উদ্ধার করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। পরবর্তীকালের বহু জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে থাকা হাল্লাজের স্মৃতি ও তাঁকে নিয়ে রচনা তিনি ১৯০০ পৃষ্ঠার চার খ- পুস্তকে তুলে এনেছেন। হাল্লাজের কাব্য সম্পর্কে লুই মেসিনিউর ভাবনা দেখা যাক :
তাঁর কবিতা পরম মরমের সঙ্গে তাঁর নিজ মরমের কথোপকথন। সেই আলাপের বিষয় তাদের পারস্পরিক প্রেম। … তাঁর কালের আর কোন মরমি নিজেকে খোদার সাথে এমন ঘরোয়া করে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেননি। এখানে তিনি নিরন্তর আমি, তুমি এবং আমরা_ এমন সব সর্বনাম ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তবু পরবর্তী সময়ের কবিদের মত কোথাও তাতে আটপৌরে প্রেমের প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায় না।… হাল্লাজের কবিতার মত আর কোন মরমি কবিতাতে এমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা অথচ একইসঙ্গে এত ‘র‌্যাডিকেল বস্তুভাব’ পাওয়া যায় না।
তাঁর কবিতায় মাঝে মাঝে তিনি পূর্ববর্তী সুফিদের গড়ে তোলা প্রতীকে ফিরে গেছেন। সাধারণভাবে তাঁর কবিতা নবম শতাব্দীর গড়ে ওঠা সুফি কবিতার ধরন অনুসরণ করেছে। তিনি ছোট দুই বা চার লাইনের কবিতায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন যা পরবর্তী পারস্য সুফিদের রুবাই বা চতুর্পদি কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
হাল্লাজ সর্বত্র খোদাকে দেখেছেন :
হে সূর্য্য, পূর্ণ চন্দ্র, ওহে দিনের আলো
আমার কাছে তুমিই স্বর্গ, তুমিই নরক।
খোদাশূন্য কোনো জায়গা কি থাকতে পারে? অথচ তবু মানুষ অন্ধত্বের বশে তাঁকে দেখতে পায় না, যদিও তিনি নির্নিমেষে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
মরমি যখন কেবল প্রেমাষ্পদের স্মরণে মগ্ন থাকেন, তখন তাঁর হৃদয় প্রেমাষ্পদের প্রেমে কানায় কানায় পূর্ণ হয়, তখন তার বহুমুখী আশা, বাসনা এবং ভাবনা এক ভাবনায় সম্মিলিত হয়। সেই ভাবনা শুধু প্রেম আর আন্তরিকতার।
শপথ খোদার, হয়নি উদয়, অস্ত যায়নি সূর্য্য কোন
শুধু আমার নিঃশ্বাসে এই তোমার প্রেমের আবেশ ছিল।
প্রেমিক পরম সত্যের চূড়ান্ত নৈকট্য অনুভব করে বলে :
অন্তর আর তার আবরণের মধ্য হতে
তুমি বেরিয়ে আসো নয়ন হতে অশ্রু যেন।
আর সেই প্রেমময় দ্বিধায় সে বারবার প্রশ্ন করে :
হায়! একী আমি না তুমি? এযে দুই খোদা!
তখন সে প্রেমাষ্পদের কাছে প্রার্থনা করে তাঁর সঙ্কীর্ণ, যাতনাময় আমিকে গ্রহণ করে সে আমিকে বিলোপ করে দিতে। হাল্লাজের সবচে’ বিখ্যাত কবিতা বোধ হয় ‘উকতুলুনিয়া শিকাতি আন ফি কতলে হায়াতি’ (আমায় হত্যা কর…)। তিনি বিশ্বস্ত বন্ধুদের ডেকে তাঁকে হত্যা করার অনুরোধ করছেন। মৃত্যুই তাঁর কাছে পরম প্রেমাষ্পদের সঙ্গে স্থায়ী মিলনের একমাত্র পথ। এই কারণেই এই প্রশস্তি কাব্য পরবর্তী মরমিরা বারবার উচ্চারণ করেছেন :
আমায় হত্যা করো, হে আমার বিশ্বস্ত বন্ধুজন
আমার মৃত্যুতেই যে আমার জীবন।
এখানে আত্মিক মৃত্যু আর পুনরুত্থানের ছক কাটা আছে। মাওলানা রুমি এই ভাব অবলম্বন করেই মসনভি শরিফে, তাঁর দিওয়ানে শামনে তেত্রিজে বারবার নিজ ক্ষুদ্র সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন রূপান্তরের কথা শুনিয়েছেন।
কিছু গভীর বেদনাক্রান্ত কবিতায় হাল্লাজ শোকগাথা গেয়েছেন তাদের জন্য যারা পরম সত্যের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত, কারণ সেই সত্যের সাক্ষী চলে গেছে দূরে। তিনিই আবার কোনো দুর্লভ ক্ষণে লাভ করা জীব ও পরম মরমের ঐক্যের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন :
হৃদয়ের দৃষ্টি মেলে দেখেছি প্রভুকে আমার
প্রশ্ন করি ‘কে তুমি’, সে বলে ‘তুমি’
অথবা
আমি যারে চাই আমি হয়ে গেছি সে
যাকে আমি চাই সে হয়ে গেছে আমি
ফলে আমি ও আমার প্রেমাষ্পদ কস্তুরি আর কস্তুরি মৃগের মতো অভিন্ন হয়ে গেছি। এ যেন :
তোমার প্রাণ এমনভাবে মিলেছে আমার প্রাণে
মিশেছে যেন তীব্র সুরা স্বচ্ছ জলের সাথে
তোমার কিছু ছুঁয়ে গেলে আমায় ছুঁয়ে যাবে
‘তুমি’ আজ হয়েছে ‘আমি’ সব হালে
হাল্লাজ সাহসী ছিলেন। ফলে ‘আখবার আল-হাল্লাজ’ এ বলতে পেরেছেন যে প্রেমের চূড়ান্ত মত্ততায় ‘প্রেমিকের প্রথাগত প্রার্থনা হল অবিশ্বাসের প্রকাশ’। প্রেমাষ্পদের ক্রুদ্ধতা ডেকে আনলে তাঁর অভিশাপ, তাঁর দেয়া শাস্তিতেও তাঁরই স্পর্শ পাওয়া যায় :
পুণ্যের পথ ধরে চাই না তোমায়
দুঃখের মাঝ দিয়ে এসো হে প্রিয়
তাঁর বহু উপমা, তাঁর ‘আনাল হক’-এর মতো উচ্চারণ আজকের ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ পর্যন্ত বহু কবি-লেখক গ্রহণ ও ব্যবহার করেছেন। কালের সাপেক্ষে এর নতুন অর্থ দাঁড় করিয়েছেন। আধিপত্যশীল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাতে নেমে যারা নিজ মতের জন্য নির্যাতন সয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি তাদের সামনে পথিকৃৎ হয়ে এসেছেন। সেই প্রকাশ কখনো ধর্মীয় কখনো রাজনৈতিক।
কালের সঙ্গে হাল্লাজ কেমন করে নতুন অর্থে হাজির হলেন সে ব্যাপরটা উর্দু কাব্যের ছোট্ট খতিয়ান নিয়ে দেখা যাক। খাজা মীর দর্দ তাঁর গজলে হাল্লাজের মৃত্যুবরণের ঘটনাটিকে প্রেমাষ্পদের অবহেলা অতিক্রম করতে প্রেমিকের অপূর্ব কৌশল বলে তুলে ধরেছেন। পরম নৈর্ব্যক্তিক প্রেমাষ্পদকে প্রেমিক যেন বিরক্ত করার ছলে মনোযোগ আকর্ষণ করে।

তাদের গাল-মন্দ, দুর্নাম জুটলেও তার ক্ষণিকের দৃষ্টি তো প্রেমিকের ভাগ্যে জোটে!
জুঁ জুঁ ও কঢ়ে হ্যায় য়েহি আত্তয়ে হ্যায় জি মে
য়াস ছেড়িয়ে অত্তর বাতে সুনা কিজিয়ে উসসে
(যত সে বিরক্ত হয় ততই আমার মনে এই ইচ্ছে জাগে
আরেকটু বিরক্ত করি, আরেকটু কথা শুনি তার)
কাব্যেশ্বর (খুদায়ে সুখান) মীর তকি মীর বসন্ত আগমনের চূড়ান্ত তীব্রতায় হাল্লাজের প্রাণ উৎসর্গের আহ্বান শুধু শুনতে নয় দেখতেও পান। এখানে শ্রবণ ও দৃষ্টি একাকার :
আয়ি বাহার তো নখলে দার পে মীর
সরে মনসুর হি কা বার আয়া
(বসন্ত এসেছে, ফাঁসি কাঠের শুকনো ডালে
মনসুরের আঘাত পত্র-পল্লব হয়ে আমায় ডাকে)
মির্জা গালিব চিরায়ত ভারত ভাঙনের যুগের কবি। প্রথাকে প্রশ্ন করা এর প্রমাণ :
কাতরা হামারা আসল মে দরিয়া হ্যায় লেকিন
ঘামকো তকলিদে তুনুক যর্ফিয়ে মনসুর নেহি
(তোমার এক বিন্দু জল আসলে সমুদ্র, তবে
মনসুরের প্রকাশভঙ্গি আমার আদতে পছন্দ নয়)
হাল্লাজের উপলব্ধি গালিবও ধারণ করেন, তবে কালের বদলে যাওয়ায় সেই সত্য উপলব্ধি প্রকাশের নতুন ধরন অনুসন্ধানের পক্ষপাতী তিনি।
এর কিছুকাল পরে জুররাত বলছেন :
আবহা কিয়া লোগো নে জো মনসুর কো সুলি পে চঢ়ায়া
খুদ মনসুর কো না গাওয়ার থা জিনা রাযদাঁ হো কার
(ভালোই করেছে লোকেরা মনসুরকে শূলে চড়িয়ে
খোদ মনসুরের বাঁচতে ইচ্ছা ছিল না সেই রহস্য জেনে)
মোহাম্মদ ইকবাল তো তাঁর মহাকাব্যিক ‘জাভেদ নামা’য় হাল্লাজকে চির পথ চলা মানব তৃষ্ণায় চরিত্র হিসেবে রূপায়ণ করেছেন। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ জেনারেল জিয়াউল হক-এর সামরিক শাসনের কালে প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয় কবিতায় বলছেন :
জাব যুল্ম ও সিতাম কে কোহে গারা
রুঈ কি তরহা উড় জায়েঙ্গে
হাম মেহকুমো কে পাও তলে
য়ে ধরতি ধড়্ ধড়্ ধড়কেগি
ঘাম এহলে সাফা মরদুদে হারম
এসনদ পে বিঠায়ে জায়েঙ্গে
গব তাজ উছলে জায়েঙ্গে
গব তখ্ত গিরায়ে জায়েঙ্গে

উঠ্ঠেগা আনাল হক কা নারা
জো ম্যায় ভি হুঁ অত্তর তুম ভি হো
অত্তর রাজ করেগা খল্কে খুদা
জো ম্যায় ভি হুঁ অত্তর তুম ভি হো
(যখন অত্যাচার নিপীড়নের চেপে বসা পাহাড়
তুলোর মতন উড়ে যাবে
নির্যাতিত বঞ্চিত আমাদের পায়ের তলে
এই পৃথিবী থরথর করে কাঁপবে।

পবিত্র গৃহ থেকে বিতাড়িত বিশ্বাসী
আমরাই সিংহাসনে বসবে
সমস্ত মুকুট ছুঁড়ে ফেলা হবে
সব সিংহাসন উপড়ে ফেলা হবে

‘আমিই সত্য’ নিনাদ উঠবে চারি দিকে
যে সত্য আমি, যে সত্য তুমি
খোদার সৃষ্টি তখন শাসন করবে
যে সৃষ্টি আমি, যে সৃষ্টি তুমি)
‘আনাল হক’ এর ব্যক্তি অভিজ্ঞতা, ফয়েজের সময়ে এসে বিশ্ব মানবের উপলব্ধি হয়ে গেল। এই একই শাসনামলে আমৃত্যু প্রতিবাদী কবি হাবিক জালিয লিখছেন :
ম্যায় ভি খায়িফ নেহি তাখতায়ে দার সে
ম্যায় ভি মনসুর হুঁ কেহ্ দো আগয়ার সে
কিঁউ ডরাতে হে যিন্দান কি দিওয়ার সে?
সুলম কি বাত কো
জেহেল কি রাত কো
ম্যায় নেহি মানতা
ম্যায় নেহি জানতা
(ফাঁসি কাঠের পাটাতন ভয় পাই না আমি
আমিও মনসুর_ জানিয়ে দাও শত্রুকে
কারাগারের দেয়ালের ভয় দেখাও কেন আর?
সেই নির্দয়তার বার্তা
এই অজ্ঞানতার রাত
আমি মানি না
আমি মানবো না।)
হাল্লাজের কবিতায় উদ্দীপ্ত উচ্চারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। খোদা যেহেতু প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষের ক্রিয়াকে উতরে আগে থাকেন, তা হলে মানুষের খোদা স্মরণও মানুষকে খোদার ডাক অতিক্রম করে যেতে পারে না :
আমি তোমায় ডাকছি_ নাকি ডাকছো তুমিই তোমার কাছে
ডেকে উঠলাম_ তুমিই আছো, না ‘আমিই আছি’ বলছো তুমি
হাল্লাজের কবিতা অনেক ভদ্রগোছের মরমিদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে এই কবিতাগুলোই পরবর্তী ফার্সি ও উর্দু কাব্যে সবচে’ বড় ভাব, রূপক, তুলনা, উপমা ও উৎপেক্ষার জোগানদার হয়েছে।
হাল্লাজ স্মরণের গুরুত্ব মেনে নিয়েও জানতেন যে এই স্মরণ যান্ত্রিকতার অভ্যাসদোষে দুষ্ট হলে স্মরণের ছলে ভুলে থাকাই জিইয়ে রাখে :
স্মরণের পথ আমার দৃষ্টি হতে
তোমায় লুকিয়ে রাখে
এই প্রশ্ন অনেক পুরনো। শব্দ, স্মরণ বা আবৃত্তি আসলে পরম সত্যের আবরণ উন্মোচনে কতটা কাজে দেয়? হাল্লাজ অক্ষরের এই পৌত্তলিকতা অনাবৃত করতে চেয়ে জীবন সাধন করে গেছেন।
তাজকিরাত আল-আত্তলিয়ায় আত্তার লেখেছিলেন যে মৃত্যুদ-কালে পাথরের আঘাত হাসি মুখে সয়েও হাল্লাজ বন্ধু শিবলির ছুড়ে মারা গোলাপের আঘাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। তুর্কি প্রবাদে এখনো বলা হয় ‘দোস্তান আত্তিগি গুল ওনার’- বন্ধুর ছুড়ে মারা গোলাপে আঘাত লাগে। গোপন সত্য প্রকাশে নিঃসংশয় হাল্লাজের তুলনায় শিবলির একটি কবিতার পার্থক্য দেখুন :
খোদাকে ধন্যবাদ, যে আমি
সমুদ্রে বসত করা ব্যাঙের মতন :
যখন সে বলতে চায় কিছু, মুখ পূর্ণ হয় জলে
আবার নীরবতা জ্বালায় অসহ বেদনায়।
হাল্লাজ নোনা জলের ভয়ে মুখ খুলতে ভয় পাননি। ফলে তাঁর কবিতা প্রাচ্য জগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে প্রকাশের মাত্রায় চিরতরে পাল্টে দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে। হাল্লাজের সঙ্গে সুফি ইতিহাস ও কাব্য প্রথম ক্লাইমেক্সে পেঁৗছায়। তার মৃত্যুর কিছু দিন পরে আবু নাসর আব্দুল্লাহ বিন আলী আল-সাররাজ আল-তুসি তাঁর ‘কিতাব আল-লুমা’য় লেখেন :
সুফি চিন্তার মানুষেরা গেছে চলে
সুফিবাদ এখন শতচ্ছিন্ন এক জামা ছাড়া কিছু নয়;
সেই বিশেষ জ্ঞান গেছে চলে
কোন আলোকিত হৃদয় বাকি নেই।
আদতেই, হাল্লাজের পরে বেশ কয়েক শতাব্দী তেমন মহৎ কোনো আরবি সুফি কবিতা পাওয়া যায়নি। লেখা হয়েছে সুফি চিন্তা ও চর্চার প্রাণহীন গুরুত্বপূর্ণ সব গদ্যপুস্তক। সেই কবিতা আবার পাওয়া গেল ত্রয়োদশ শতাব্দীতে; চেঙ্গিস খান ও তাঁর উত্তরসূরিদের তুলনাহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞের কালে। এই শতাব্দীতেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন ইবনে আরাবি, ফারসি মরমি কাব্য চরম উৎকর্ষে পৌঁছায় মাওলানা রুমির হাত ধরে। হাল্লাজের বুনে যাওয়া মানুষের সীমাহীন সম্ভাবনার বাণী মরক্কো থেকে ট্রানসক্সোনিয়া, তুরস্ক থেকে বাংলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এই শতাব্দীতেই। যে অসহনীয় যাতনাপূর্ণ সাধারণ সমাজ জীবনকে অস্তিত্বে ধারণ করে, যার নীরবতার রহস্যকে সাধারণে প্রকাশ করে হাল্লাজ মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেই রকমই আরেক পৃথিবীতে তিনি আবার ফিরে এলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত, কানু বিনে যেমন গীত নেই, হাল্লাজ ছাড়াও সুফি কাব্য নেই।

http://jolbhumi.blogspot.com/2012/03/blog-post_4308.html

———————————————————————————————-
অন্তহীন এ পথ
মীজান রহমান
অনেকদিনই তো হাঁটা হল এপথে। মনে হয় অনন্তকাল ধরেই হাঁটছি। হাঁটছি আর হাঁটছি। এ পথের শেষ নেই। শুরু কোথায় তা?ও জানিনা ভাল করে। সেদিন এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা এক কফির দোকানে। জিজ্ঞেস করলেনঃ হোয়ের আর ইউ ফ্রম? তাইতো, কোত্থেকে এসেছি আমি? চট্করে কোনও জবাব মুখে এল না। স্থূলার্থে বলা যেত বাংলাদেশ। সেটা সহজ উত্তর। সে-উত্তর প্রশ্নের মূলে যায় না। বাংলাদেশ নামক দেশটির বয়স তো আমার চেয়ে অনেক কম। আমি যখন ক্যানাডায় আসি তখন আমার দেশ ছিল পাকিস্তান। আমার জন্ম কিন্তু পাকিস্তানে নয়, ব্রিটিশ ভারতে, যখন এর নাম ছিল ভারতবর্ষ। তারও আগে, অনেক অনেক আগে সেটা ছিল মোগল ভারত, বৌদ্ধ ভারত, মৌর্য ভারত, আর্য ভারত—। তাহলে নৃতাত্বিক দৃষ্টিতে আমি কে? আমার আদিবাস কোথায়? আপনিই বলুন, হোয়ের এম আই ফ্রম?
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে ?অহম? বা ?আমি? নিয়ে একটা মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল। ?অহম? কি একটি ব্যক্তি, বস্তুনির্মিত বিশেষ কোনও সত্তা, নাকি একটা আইডিয়া মাত্র? আত্মা? মায়া? গ্রীক শাস্ত্রে সক্রেটিসই(খৃঃপূঃ ৪৭০-৩৯৯) বোধ হয় সর্বপ্রথম উত্থাপন করেছিলেন প্রশ্নটি—লোকটার তো স্বভাবই ছিল এই, সবকিছুতে প্রশ্ন তোলাঃ কি, কেন, কবে, কোথায়। তাঁর বানী ছিল ? নিজেকে জানো? । নো দাইসেলফ। এই জিজ্ঞাসার পথ ধরে ভারতীয় অধ্যাত্নবাদী চিন্তায় একসময় ?সোহম? শব্দটি জন্মলাভ করে, যাতে করে আত্না এবং পরমাত্নার সমন্বয় বা সমীকরণ স্থাপিত হয়ে যায়। ?সোহমের? অনুরূপ ভাবনা পাশ্চাত্য দর্শনে স্থান পেয়েছিল কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু ইসলামের সুফি ভাবধারাতে এর বলিষ্ঠতম প্রকাশ ঘটেছিল মনসুর আল হাল্লাজ (৮৫৮-৯২২)নামক এক অর্ধ উন্মাদ সুফির ?আনাল হক? (আমিই সত্য, মহাসত্য)ঘোষণাটিতে (যে-অপরাধে খলিফা আল-মুক্তাদির তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন)।
বিজ্ঞানের তখন শৈশবাবস্থা। আধুনিক বিজ্ঞানের সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কোনরকম চিন্তাই প্রবেশ করেনি মানুষের মনে। সেকালের বিজ্ঞান ছিল মূলত অভিজ্ঞতাভিত্তিক—যা খালি চোখে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়, দৈর্ঘপ্রস্থ বোঝা যায় কাঠের কাঠি দিয়ে, তার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের চিন্তা। সাধারণ বুদ্ধি,— কমন সেন্স—ছিল বিজ্ঞানের প্রধান বাহন। হয়ত সেকারণেই পুরাকালের চিন্তাশীল মনীষীরা সাধারণ বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে একটা গূঢ়তর, ইন্দ্রিয়াতীত জগত রচনা করতে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন কল্পনার রঙ দিয়ে। বস্তুর উর্ধে একটা নৈর্বস্তুক অস্তিত্ব, একটা ছায়াচ্ছন্ন মায়াময় জগত, যার সাধনাতে ধ্যানমগ্ন হয়ে তাঁরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন একটা বিকল্প, বিমূর্ত, বাস্তবতা। বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিশ্বাস যেমন ছিল মহাবিশ্বের ভূকেন্দ্রিক মতবাদ, তেমনি হয়ত মানবকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে উপস্থিত ছিলেন এই রহস্যময় সত্তাটি—?অহম?, যার চূড়ান্ত স্বরূপ প্রকাশ পায় ?সোহম? আর ?আনাল হক? জাতীয় দুঃসাহসী ঘোষণাতে।
আজকের বিজ্ঞানের প্রধান বাহন কিন্তু অভিজ্ঞতা বা সাধারণ বুদ্ধি নয়। অভিজ্ঞতার বলয়তে প্রকৃতির অনেক রহস্যেরই দ্বারোদ্ঘাটন করে দিয়েছেন আইজ্যাক নিউটন(১৬৪২-১৭২৭)। বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫)এসে আমাদের কল্পনাকে আরো অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেলেন—যেখানে সাধারণ বুদ্ধি বেশ বড়রকমের একটা ধাক্কা খায় ?সময়? নামক একটি চতুর্থ মাত্রা সংযুক্ত হওয়াতে আমাদের দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতাভিত্তিক ব্যাপ্তিভাবনাতে। আলোকরশ্নিকে আমাদের নতুনভাবে দেখতে শুরু করতে হয়। মেনে নিতে হয় যে যা স্থূল দৃষ্টির আলোতে ধরা দেয় সত্যিকার বাস্তব হয়ত তা নয়। দূর আকাশের গ্রহতারা নীহারিকাদির প্রতি আমাদের চর্মচক্ষুভিত্তিক চিন্তাধারাকে আমূল বদলে ফেলতে হয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে আইনস্টাইনের নিজেরই স্বতন্ত্র একটি কাজের মধ্য দিয়ে, যাতে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আলোকরশ্নি অনেক সময় অণুর মত ব্যবহার করে, তড়িতচৌম্বিকতামূলক তরঙ্গই কেবল নয়। এই যুগান্তকারী আইডিয়া থেকেই কালে কালে উৎসারিত হয় এক অভিনব বিজ্ঞান, যাকে আজকাল ?কুয়ান্টাম তত্ব? বলে অভিহিত করা হয়। এমনই অদ্ভুত এই বিজ্ঞান যে সাধারণ বুদ্ধি একেবারেই কাজে লাগে না এখানে—সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাতে এর বিন্দুমাত্র ছায়াপাত ঘটেনা। ফলে সবকিছুই কেমন ভোজবাজির মত মনে হয় আমাদের কাছে। কুয়ান্টাম জগতে সাধারণ দাঁড়িপাল্লা, চোখে-দেখা বাস্তব, এসবের কোনও মূল্য নেই। এজগত অণু-পরমাণুর জগত। এখানকার নিয়মকানুন সম্পূর্ণ আলাদা—নিউটন সাহেবের এত ভারি ভারি তত্ব, সব অকেজো এখানে।
আধুনিক প্রযুক্তির কল্যানে ?অণু? এখন মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে একরকম। বর্তমান যুগের সাধারণ বুদ্ধির আওতায় এসে গেছে শব্দটি। সবাই মোটামুটি মেনে নিয়েছে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই অণু দিয়ে তৈরি—সৃষ্টির ইটপাথর হল এই ক্ষুদ্র কণাটি। তবে কেউ যেন ভেবে না বসেন যে অণুর অস্তিত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কার। মোটেও নয়। গ্রীক দর্শনের অন্যতম আদিপুরুষ ডেমোক্রিটাস (খৃঃপূঃ ৪৬০-৩৭০)সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল উপাদান হল কণা, সূক্ষাতিসূক্ষ কণা, যা খালি চোখে দেহা সম্ভব নয় কারো পক্ষে। এটা তিনি কোনও যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে বের করেছিলেন তা নয়, একান্তই যুক্তিতর্ক দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তাঁর যুক্তিটি ছিল এরকম। ধরুণ একটা বস্তুকে দু?খণ্ডে ভাগ করা হল। তারপর চারখণ্ড, তারপর আট, ষোল,?..,এভাবে ভাগ করে গেলে শেষমেষ কি দাঁড়াবে? বস্তু তো একবারে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেনা, সুতরাং সবশেষে এমন একটা জিনিস দাঁড়াবে যা চোখেই দেখা যাবে না, অতএব তাকে আর ভাগ করা সম্ভব হবে না। এই অবিভাজ্য, অখণ্ডনীয় বস্তুটিকেই তিনি নাম দিয়েছিলেন ?এটম?—অণু। গ্রীক Atomos (যার আক্ষরিক অর্থ অকর্তিত) থেকে এর উৎপত্তি। সুতরাং এই লোকটিকে ?অণু?র জনক বলা হয়ত ভুল হবে না। তাঁর এই অসাধারণ আইডিয়াটি সেকালের চিন্তাবিদ সমাজ সোৎসাহে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন তা নয়। বিশেষ করে মহামতি প্লেটো (খৃঃপূঃ ৪২৭-৩৪৭)তো সহ্যই করতে পারতেন না ?এটম? শব্দটি কেউ তাঁর সামনে উচ্চারণ করলে—ঘোর বিরোধী ছিলেন পদার্থের আণবিকতা তত্বের। তাঁর ভয়ে ডেমোক্রিটাসের ভক্তরা টুঁ শব্দটি করেনি যদ্দিন তিনি বেঁচে ছিলেন। মহাপুরুষের মৃত্যুর পর প্রথম মুখ খুললেন আরেক দার্শনিক এপিকিউরাস (খৃঃপূঃ ৩৪২-২৭০)।তিনিও খুব একটা সমর্থন পাননি সমসাময়িক পণ্ডিতদের কাছ থেকে। এটমের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ওজস্বী প্রবক্তা ছিলেন লুক্রেটিয়াস (খৃঃপূঃ ৯৮-৫৫), (যদিও তিনি ছিলেন রোমান)যাঁর প্রনীত গ্রন্থ এখনো বিক্রি হয় বাজারে।
দর্শনশাস্ত্রের আইডিয়াজগত থেকে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক জগতে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে ?অণু?কে প্রায় ১৮৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লুডভিগ বল্জম্যান (১৮৪৪-১৯০৫) তাপবলবিদ্যার (Thermodynamics) যাবতীয় বিষয়ের আণবিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের যে নতুন একটি শাখা (Statistical Mechanics)সৃষ্টি করলেন তারই বরাতে বিজ্ঞানজগতে বস্তুর ?অণু?ত্বের আইডিয়াটি শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।পরবর্তীতে আলোকরশ্নির প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) দেখালেন যে আলোর গতিবিধির কোনও ঠিকঠিকানা নেই—একেক সময় একেকরকম ব্যবহার করে। কখনো তরঙ্গ, কখনো কণা। কণার কথা আগেই বলেছিলেন নিউটন, তুলনা করেছিলেন অনেকটা বিলিয়ার্ড বলের সরলরেখায় চলার মত, কিন্তু আলো যে দুটোই হতে পারে সেটা তাঁর মাথায় ঢোকেনি—সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান তখনো অতটা অগ্রসর হয়নি। আইনস্টাইন এই আলোকণাটির নাম দিলেনঃ photon। তাঁর গবেষণাতে দেখানো হয়েছিল আলোকরশ্নি একটা বিশেষ ধাতুনির্মিত পাতের ওপর বর্ষিত হতে থাকলে একটা পর্যায়ে সেই পাত থেকে একটি দুটি ইলেক্ট্রন ছিটকে পড়বে। অনেকটা ঢিল ছুড়ে দেয়াল থেকে চূন খসিয়ে ফেলার মত। এই আপাত সরল একটি আইডিয়া দ্রুত পরিবর্ধিত ও পরমার্জিত হয়ে বর্তমান যুগের ?কুয়ান্টাম তত্বে? রূপান্তরিত হয়। এ তত্ব এমনই যুগান্তকারি যে আগেকার শত শত বছরের বিজ্ঞানকে প্রায় নাকচ করে দেবার অবস্থায় এনে দেয়। নাকচ অবশ্য হয়নি সৌভাগ্যবশত, কারণ সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের জন্যে নতুন তত্বের চেয়ে পুরনো তত্ব, অর্থাৎ গ্যালিলি-নিউটন-ম্যাক্সওয়েল তত্বই ষোল আনা কার্যকর। মোদ্দা কথা হল দুটির দুই এলাকা। একটি ঠিক আরেকটি ভুল তা নয়—দুটোই ঠিক, কিন্তু নিজ নিজ এলাকাতে। কুয়ান্টাম তত্বের নায়ক নায়িকা হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা, যেমন ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ফোটন—এরা নিউটন-গ্যালিলির আইনকানুন একেবারেই মানে না। আর সাধারণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্র হল আমাদের এই অতিপরিচিত পৃথিবী, গ্রহ তারা, পাহাড় পর্বত, আকাশ সাগর, আমরা, আমাদের স্থূল বস্তুজগত। মূলত আমরাও কণার সমষ্টি, কিন্তু এতই অগণিত সে সমষ্টি যে শেষমেষ কণার কোনও আলাদা অস্তিত্ব থাকেনা—তখন কুয়ান্টামের এলাকা ছাড়িয়ে আমরা নিউটনের এলাকাতে চলে যাই। কিন্তু কণার জগত এক বিশাল ও বিচিত্র জগত—সে জগত শুধু আমাদের দৃষ্টির বাইরেই নয়, বোধবুদ্ধিরও বাইরে। আমাদের ?সাধারণ বুদ্ধি? সেখানে দারুণ মার খেয়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণ যুক্তিতর্ক দিয়ে কুয়ান্টাম তত্ব বোঝার চেষ্টা নেহাৎ বোকামি—লাভ হবে না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুণ একটা ঢিল ছোঁড়া হল উপরের দিকে একটা বিশেষ গতিতে। ঠিক কোন দিকটিতে সেটা ছোঁড়া হল সেটা যদি সঠিকভাবে জানা থাকে আপনার তাহলে নিউটনের গতিতত্বের সমীকরণসমূহের সাহায্যে আপনি অনায়াসে বের করে ফেলতে পারবেন ঠিক কোন বিন্দুতে গিয়ে সেই ঢিলটি মাটিতে পড়বে। কিন্তু এটি যদি ঢিল না হয়ে একটি অণু হত, যার গতিবেগ প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি (অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১৮৬,২৮২ মাইল) তাহলে কিন্তু অণুটির গতি আর অবস্থান দুটোই সমান নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভন হবে না আপনার পক্ষে—একটা মাপতে গেলে আরেকটা এতটাই বাধাগ্রস্ত হবে যে সব গণনাই ওলটপালট হয়ে যাবে। এটা আপনার চেষ্টার ত্রুটি নয়, এটাই ঐ জগতের আইন। শুধু তাই নয়, অণুরা ঠিক কোন রাস্তা দিয়ে চলে সেটাও আপনার জ্ঞানের বাইরে। কেবল এটুকুই বলা সম্ভব আপনার পক্ষে যে কণাটির অমুক রাস্তা দিয়ে চলার ?সম্ভাবনা? (probability)অতখানি, অন্য আরেকটি পথ দিয়ে চলার সম্ভাবনা এই। তার বেশি নয়। বলা যায় অণুরা কোনও বিশেষ একটি পথ বাছাই করে চলে না, চারদিকে একটা ? সম্ভাবনার ধোঁয়া? ছড়াতে ছড়াতে চলে। অর্থাৎ তার গতিপথ ঐ ধোঁয়াটির যেকোন পথেই তার যাবার সম্ভাবনা আছে—কোনটাতে কম, কোনটাতে বেশি। আপনি হতবাক হয়ে বলবেন এ আবার কেমন আইন? এতো কোন আইনই হল না। বিশ্বাস করুন এভাবেই চলছে আমাদের অণুকণাদের বাস্তব জীবন—এবং এরকম অদ্ভুত সব নিয়মকানুন মেনে চলা সত্বেও গবেষকদের পুনরাবৃত্ত পরীক্ষায় এর অকাট্যতা নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে।
আমার বর্তমান নিবন্ধের জন্যে কেবল এটুকুই যথেষ্ঠ যে সাধারণ বুদ্ধি আর দৈনন্দিন জীবনের বেলায় যা প্রযোজ্য তার কোনটাই প্রযোজ্য নয় অণুর জগতে। হতবুদ্ধি হয়ে আমরা সাধারণ মানুষ হয়ত বলতে পারি, আমরা সবাই যদি মূলত অণু দিয়ে তৈরি হয়ে থাকি তাহলে এটা কি করে হয় যে আমাদের শরীরের কণাগুলি পালন করে এক নিয়ম আর শরীর করে আরেক নিয়ম? প্রকৃতি কি এতই খামখেয়ালি? না, এটা প্রকৃতির খামখেয়ালি স্বভাব নয়, আমাদের বুঝার ভুল। প্রকৃতির বুনোটটাই এরকম—এভাবেই আঁকা হয়েছে এর নীলনকশা। এরই ওপর নির্ভর করে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা, এর ভারসাম্য। বিংশ শতাব্দীর আগে বিজ্ঞান অতটা অগ্রসর হতে পারেনি বলে প্রকৃতির এই দ্বৈতচরিত্র ধরা পড়েনি এতদিন। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অনেক ঝানু বিজ্ঞানীরই হয়ত পরিষ্কার ধারণা নেই কুয়ান্টাম তত্ব জিনিসটা আসলে কি। একেকজন একেকভাবে দেখে একে। এমনই এক রহস্যঘেরা বিষয় এটি যে এর অবগুন্ঠন উন্মোচন করে এর সত্যিকার রূপ উপলব্ধি করার ক্ষমতা খুব মানুষের নেই। পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, নোবেলবিজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-১৯৮৮) একজায়গায় বলেছিলেন, আধো কৌতুকের সুরেঃ ?আমি নির্ভয়ে ঘোষণা করতে পারি যে কুয়ান্টাম তত্ব বোঝার মত লোক কোথাও নেই!? কুয়ান্টাম নিয়ে আরেকটা জনপ্রিয় কৌতুকঃ ?কুয়ান্টাম বিজ্ঞান থাকতে নেশাখোরের গাঁজা লাগবে কেন??
আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র নই, গণিতের। তবুও কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে কুয়ান্টাম তত্বের ওপর দুয়েকটা বই পড়ার চেষ্টা করেছি। পড়ার সময় মনে হয়েছে, বাহ্, বেশ তো, এমন কি কঠিন জিনিস এটা। তারপর বই বন্ধ করে ভাবতে বসে টের পেলাম যে আসলে কিছুই বুঝিনি। এবং সলজ্জে স্বীকার করছি যে সে-অবস্থার কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি এখনো। রিচার্ড ফাইনম্যানের উক্তিটি অন্তত আমার বেলায় ষোল আনা সত্য। তবে ফাইনম্যানের বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনী যারা জানেন কিছুটা তারা খুব ভাল করেই বুঝবেন যে কথাটি তিনি বলেছিলেন নেহাৎ রসচ্ছলে—প্রচণ্ডরকমের রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি যে কতবড় পণ্ডিত কুয়ান্টাম শাস্ত্রে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাবেন স্টিফেন হকিং আর লেনার্ড ম্লোডিনোর হালের বই ? গ্র্যাণ্ড ডিজাইন? পড়লে। সুতরাং ফাইনম্যানের রসিকতার অর্থ সবাই বুঝবে—এটা তাঁর বিনয় মাত্র।
কিন্তু আমার জন্যে এটা বিনয় মোটেও নয়, সাদামাঠা স্বীকারোক্তি। শুধু এটুকুই বুঝেছি আমি যে আকারে ক্ষুদ্র হলেই জিনিসটা তুচ্ছ নয়, কারণ আমরা প্রত্যেকেই এই ?তুচ্ছ? কণা দিয়ে তৈরি। এক হিসেবে আমার ভেতরকার প্রতিটি কণাই আমার চেয়ে হাজারগুণে বেশি শক্তিশালী। পক্ষান্তরে পৃথক পৃথক কণারও নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই অনেক অনেক কণা একত্র না হওয়া পর্যন্ত।হকিং-ম্লোবিনোর বই থেকে একটা উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছিঃ ??individual objects don?t even have an independent existence but rather exist only as part of an ensemble of many?.
এ আরেক ধাঁধা কুয়ান্টাম তত্বের। অর্বুদ কোটি অণু না হলে একটা জলবিন্দু হয়না, আবার একটি জলবিন্দু আপনা আপনি কোনও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবেনা, অণুর পর্যায়ে বিপুল কোনও বিবর্তন না ঘটলে। প্রতিটি বস্তুরই এই একই ধর্ম। আমাদের মূল পরিচয় আর অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে গিয়ে এই কথাগুলি বারবার উঠে আসে মনে। সত্যি তো, আমি তো কেউ নই। আমি মূলেতে একটি বিন্দু যার নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই। আমি একটা স্রোতের অংশ, একটা প্রবাহ। কুয়ান্টাম তত্বের দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে গেলে আমি কিছু নই, আবার সবই। কেউ নই, আবার সবাই। আমি একাধারে সৃষ্টি ও স্রষ্টা, নির্মাণ ও ধ্বংস। প্রকৃতির বোধাতীত দ্বৈততার বিচিত্র লীলাভূমিতে আমি এক নগণ্য ক্রীড়নক ছাড়া কিছু নই। এখানেই আমার উৎস, আমার পরিচয়। আমি হাঁটছি, চিরকাল ধরে হাঁটছি, কারণ ওটাই আমার প্রকৃতি।

সূত্রঃ 1.The Grand Design, by Stephen Hawking and Leonard Mlodinow, Published by Bantam Books, 2010.
2. QED, the strange theory of light and matter, by Richard P.Feynman, Published by Princeton University Press, 1985.
3. Internet.
ফেব্রুয়ারি ২০১২-তে প্রকাশ হল মনসুর হাল্লাজের কবিতা (দিওয়ান-এ মনসুর হাল্লাজ)
মূল আরবি ও মুজাফ্ফর ইকবাল কৃত উর্দু ভাষান্তর হতে অনুদিত
ভূমিকা ও ভাষান্তর : জাভেদ হুসেন

কী ভেবে এই বই :

এই বইখানি মনসুর হাল্লাজের নিছক কবিতার সংকলন নয়। কবিতার সংগে আরো বহু কথা আছে। প্রাচ্যের ইতিহাস কেন ধর্মের ইতিহাস বলে মনে হয়_ সেই প্রশ্ন নিয়ে একটি অনূসন্ধান প্রয়াস এতো কথার কারণ। এইখানে আলোচনার জমিন মনসুর হাল্লাজ, তাঁর কাল, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও শ্রেণী। তিনি আম-জনতার সামনে মানুষের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সীমায় আরোহনের কথা বলেছিলেন। ফলে তৎকালীন দুনিয়ার মালিকেরা সাপেক্ষে গৌন হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র পরম সত্যের ‘আমি’র সাথে সম্পর্কেও দাবি হাল্লাজের সমকালীনদের, বিশেষ করে সেই সময়ের বাগদাদের ধনিক শ্রেণী, রাজনৈতিক কর্তাদের কাছে সমাজ বিদ্রোহের ডাক বলে প্রতিয়মান হয়েছিল। মানুষ আর পরম সত্যের মাঝের ব্যবধান ভেঙে দেয়ার চেষ্টা প্রকান্তরে মানুষকে তার কালীন বস্তুগত অধীনতার জোয়াল ভাঙার ডাক দেয়।

এই চেষ্টার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকে। মনসুর হাল্লাজেরও তা ছিল। সেই ইতিহাসের পর্দায় ফেলে তাঁকে না দেখলে তিনি সর্বকালীন চরিত্র হয়ে যাবেন। এর ফলে যে সব বিষয়গত শর্তে তিনি ইতিহাস হয়েছেন_ সে সবের কোন হদিস আর মেলে না। কোন কিছু সর্বকালীন করা মানে নির্দিষ্ট কোন কালে, তাই আমাদের কালেও ব্যাপারটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা। এই ভাব মানা যায় না বলেই ‘দিওয়ানে হাল্লাজ’-এর বর্তমান রূপ ধারণ।

হাল্লাজের কবিতা থেকে

##
আমি যারে চাই আমি হয়ে গেছি সে
যাকে আমি চাই সে হয়ে গেছে আমি
আমরা দুই প্রাণ এক শরীরেই থাকি

আমায় যখন দেখো, তোমরা তাকেই দেখ
যখন দেখো তাকে, আমায় দেখ ঠিকই

##
যে সূর্য্য, চন্দ্র, ওহে দিনের আলো
আমার কাছে তুমিই স্বর্গ, তুমি নরক

তোমার জন্য পাপকে ছাড়া, এরচে’ বড় পাপ আর কী সে?
তোমার থেকে মুখ ফেরানো- সব কিছুতে বিমুখতা

তোমার জন্য জগতজনে, জানি, ছাড়ে সব অজুহাত
যার নেই অজুহাত, সে আর বলো ছাড়বে কাকে?

##
মেঘের পরে মেঘ জমলে বন্ধুরা সব আসন পাতে
কথক তখন গল্প ছলে আমার নামের সর্ব নাশে

আমার দৃষ্টি, শ্রবণ আমার যদি তোমার প্রেমের নিদান থাকে
প্রেমকে তোমার ছাপিয়ে যাব – এটুকু আশাই বাঁচিয়ে রাখে

##
তোমার কাছ হতে দুরে যাওয়ার পরে
দুর বলে তো আর কিছু নেই আমার কাছে
নিশ্চিত আমি, দুর – নিকটে তফাৎ নেই কোন

বিরহ আমার সামনে দাঁড়িয়ে; কী প্রবল প্রাণ
প্রিয় যখন খোঁজে আমায়, আহা! কী মধুর সে বিরহ!

##
ডুবে যাওয়া মানুষের মত আমি, যার শুধু আঙুল জেগে আছে
জল থই থই সমুদ্রে হাত বাড়িয়ে খোঁজে হাত

কিসের সামনে দাঁড়িয়েছি আমি জানে না কেউ
জানে এ হৃদয়, সে যে সামলে নিয়েছে একা

হৃদয় সয়েছে কী যে দুঃখ! বৃত্তান্ত জানে সেই
তারই ইচ্ছায় আমার মৃত্যু, আমার বেঁচে ওঠা

ও আমার প্রশ্নের আতিশয্য, সকল সান্তনা আমার
ও আমার প্রাণের জীবন, আমার ধর্ম, আমার পৃথিবী

হে আমার শ্রবণ, আমার দৃষ্টি, বলো, আমিই তোমার নিশ্চয়তা
তবে কেন এই বিরহে আমায় তুমি দুরে দুরে রাখো

যদি আমার দৃষ্টি হতে লুকিয়ে থাকো অদৃশ্যতে তুমি
এই বিরহে, এ বিচ্ছেদে আমার প্রাণ তোমায় দেখে

##
ও আমার বাসনার শেষ সীমা!
ব্যাকুল আমি তোমায় নিয়ে
সঙ্গে আছে আমার ‘আমি’র ব্যাকুলতা

তোমার দেয়া নৈকট্য নিয়ে
ভাবছি আমি – তুমিই ‘আমি’

পাওয়ার খোঁজে তোমায় হারিয়েছি বার বার
তুমি আমাকেই যেন আমাতে ডুবিয়ে দিলে

আমার জীবনে তুমি আমারই অনুকম্পা
সমাধিতলে প্রশান্তি তুমিই আমার

বইটির সূচী

কী ভেবে এই বই ?

ক. সমকালের সমাজ, রাজনীতি ও দর্শন
এবং মনসুর হাল্লাজ
১. আদি মুসলিম মরমীবাদ
২. প্রথম জীবন
৩. সেহেল আল-তুসতারি’র সাথে
৪. বসরা পর্ব
৫. জানয্ দাস বিদ্রোহ
৬. কেতাবি সুফিবাদের সাথে বিচ্ছেদ
৭. হাল্লাজের ভাবনা
৮. হাল্লাজের ‘আল-হক’ধারণা
৯. চারুবাক হাল্লাজ
১০. জাদুকরি’র মিথ, সার্বিকতাবাদী প্রবণতা
১১. হাল্লাজের জ্ঞান ও রাজনীতি চর্চা
১২. শাহিদ আনি ও সুফি আবদাল
১৩. আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের দশা
১৪. বাগদাদের বিচার
১৫. ধর্মতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্র
১৬. হাল্লাজের ফিরে আসা
১৭. ফলাফল
খ. হাল্লাজের কবিতা

দিওয়ান-এ- মনসুর হাল্লাজ

গ. হাল্লাজ প্রসঙ্গে ধ্রুপদি রচনা
১. আলী বিন উসমান আলজুল্লাবি আল-হুজওয়িরি’র
কাশফ্ আল-মাহজুব- হতে
২. মনসুর আল-হাল্লাজের কথা
-ফরিদ আল-দিন আত্তার এর তাযকিরাতআল-আউলিয়া হতে
৩. আবু নাসর আব্দুল্লাহ বিন আলী আল-সাররাজ আল-তুসি-র
‘কিতাব আল-লুমা’ হতে ‘শাথ’
৪. আল-হুসেইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজের তত্ত্ব
-আল-কুশাইরি’র ‘রিসালা ইলা আল-সুফিইয়া’ হতে
৫. হাল্লাজ প্রসঙ্গে মাওলানা রুমি
মসনভি হতে
ফিহি মা ফিহি হতে
৬. ওয়াহদাত আল-ওজুদ
৭. মোহাম্মদ ইকবালের
‘জাভেদনামা’ হতে

ধারণা পরিচয়
স্থান ও ঘটনা পরিচয়
ব্যাক্তি পরিচয়
————————
বই : কিতাব আল-তাওয়াসিন, লেখক : মনসুর আল-হাল্লাজ, ভাষান্তর ও সম্পাদনা: রায়হান রাইন, প্রকাশক : সংবেদ, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১০, দাম ১৫০ টাকা

মনসুর আল-হাল্লাজ বলেছেন, ‘হে মুসলমানরা, আল্লাহর কাছ থেকে তোমরা আমাকে রক্ষা করো।’ তখনকার সময়টা যদি বিবেচনা করি, তবে এটা তাঁর অসংগত প্রার্থনা। তিনি ‘আনা আল-হক’-এর মন্ত্র দিচ্ছেন বলে শরিয়তি মুসলমানরা তাঁর ওপর ভয়ানক তেঁতে আছে। খলিফার দরবারে নালিশ উঠেছে, তিনি কাবাগৃহ ধ্বংসের প্ররোচনা দিচ্ছেন (হাল্লাজ তাঁর শিষ্য শাকিরকে রূপকার্থে নিজের কাবা ধ্বংসের উপদেশ দিয়েছিলেন। ভেতরের কথাটা ছিল ইসলামের জন্য দেহ-মন উৎসর্গ করা। কিন্তু জাহিরি সমাজ এর ভুল ব্যাখ্যা করে)। এই নিদানকালে, হাল্লাজ খোদার কাছে শরিয়তি মুসলমানদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার ভিক্ষা চাইবেন- এমনই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি করছেন একেবারে উল্টো প্রার্থনা। কেন?
কিতাব আল-তাওয়াসিন গ্রন্থে হাল্লাজ একটি রূপক দিয়েছেন। মথ যখন আগুনের মধ্যে পুড়তে পুড়তে পুরোনো রূপ হারিয়ে ফেলে, তখন সেই মিলনের চরম যাতনার প্রকাশ ‘বাগেন্দ্রিয় না সম্ভবে’। গুপ্তজ্ঞানের বাগানে হাল্লাজ যখন মথের মতো পুড়ে মরছেন, আত্মতত্ত্বের চেতন পেয়ে ছটফট করছেন, তখন জাহিরি সমাজের দুনিয়াবি ক্রোধ তো পাখির পালকের থেকেও তুচ্ছ। তাঁকে যখন জাহিরি সমাজ ‘ব্লাসফেমি’তে লটকানোর ফন্দি করছে, তখন এই আত্মভোলা সুফি বলছেন, ‘তোমরা বলছ যে আল্লাহ হারিয়ে গেছেন আমার মধ্যে। তোমরা বরং বলো যে সে হচ্ছে হুসাইন বিন মনসুর, যে হারিয়ে গেছে তাঁর (আল্লাহর) মধ্যে।’
সবাই জানেন, হাল্লাজের বাণী সেকালের মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে পশে নাই, তীরের মতো বিঁধেছে। ফলত ‘আইনসংগতভাবে’ মনসুর আল-হাল্লাজ খুন হন। এসব প্রায় এক হাজার ১০০ বছর আগের ইতিহাস।
‘কিতাব আল-তাওয়াসিন’ দশম শতকের রচনা। এতকাল পর এই কিতাবের বাংলা করলেন রায়হান রাইন। তিনি দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষক, বিশেষত বাংলার দর্শন বিষয়ে আগ্রহী। কাজেই প্রশ্নটা ওঠে, এই গ্রন্থ অনুবাদে তিনি উৎসাহী হলেন কেন? অনুবাদকের ভূমিকায় তিনি এর উত্তরের কিছু ইশারা দিয়েছেন। আমরা বইয়ের কিছু মূল প্রশ্নের ছুতো ধরে এই উত্তরটাই খুঁজব।
শরিয়ত আর মারেফতের দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে একটা দৈনন্দিন ব্যাপার। গ্রামে তো বটেই, শহরতলির অনেক চায়ের দোকানেও এসব বাহাস শোনা যায়। তাই ‘বাতেনি’ বা গুপ্তজ্ঞান পাশ্চাত্যে যেমন একটা ‘মিস্টিক’ বিষয়, বাংলায় তেমন নয়। আমাদের লৌকিক সমাজের সামান্য কথা ও গানে এসব জটিল তত্ত্বের মীমাংসা আছে। হাল্লাজের মন্ত্র তাই এ দেশে তত ভিনদেশি গানের মতো দুর্বোধ্য ঠেকবে না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মনসুর হাল্লাজের তত্ত্বকথার সার ভাবটা এ রকম: যখন ব্যক্তিসত্তা হিসেবে ‘আমি’র সৃষ্টি হয়নি, তখন শুধু ছিল এক অতীন্দ্রিয় ‘পরম উপস্থিতি’। এই উপস্থিতির ভেতরই ছিল আকারহীন সমস্ত ‘আমি’। ব্যক্তিসত্তা হিসেবে ‘আমি’ যখন সৃষ্টি হলো, সেটা পৃথক হয়ে গেল ‘পরম উপস্থিতি’ থেকে। এর পর থেকে সৃষ্ট ‘আমি’র সাধনা পরম উপস্থিতির ভেতর ফিরে যাওয়া। এর পাশাপাশি রেখে তৈত্তিরীয় উপনিষদ থেকে পড়া যাক: ‘আদিতে জগৎ বলে কিছু ছিল না। কেবল ব্রহ্ম ছিলেন। এই জগৎ তখন অব্যক্ত ব্রহ্মরূপে ছিল। তারপর নামরূপের এই দৃশ্যমান জগৎ আÍপ্রকাশ করল। ব্রহ্ম যেন নিজেই নিজেকে এভাবে সৃষ্টি করলেন।’
সৃষ্ট ‘আমি’ পরমের সঙ্গে মিলবে কেমন করে? হাল্লাজ এর নিদান দিচ্ছেন, ‘ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করার উপায় হবে প্রেম।’ আমাদের বৈষ্ণব মতের গোড়ার কথাটাও এই। ‘নব্যুয়তের প্রদীপ’ নামে একটি অধ্যায় লিখেছেন হাল্লাজ। এখানে তিনি ‘নূর মুহাম্মদ তত্ত্বে’র ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মহানবীকে দেখছেন এভাবে: তিনি সবার আদি হিসেবে স্বয়ং ‘পরম উপস্থিতি’র মধ্যে আছেন, যাঁর ‘মিশন’ হলো সবাইকে পরম উপস্থিতির দিকে টানা। গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদের রাধাতত্ত্বের মূল কথাটা এর কাছাকাছি। পরমের প্রধান শক্তি তিনটি। স্বরূপশক্তি এই তিনের মধ্যে প্রথম, যার হাদিনীশক্তি হলেন রাধা। এই রাধাই বৃন্দাবনে পরমের সঙ্গে নিত্যলীলা করেন। আর পরমের স্বরূপ জানতে জীবের মূল আশ্রয় হবেন রাধা। (শশিভূষণ দাশগুপ্ত: ২০০৬)
হাল্লাজের এই কিতাবের একটি গুরুতর ব্যাপার হলো ‘ইবলিসতত্ত্ব’। ইবলিস কিছুতেই আদমকে সেজদা দেবেন না, কারণ তিনি খোদার তাওহিদ ঘোষণা করেছেন। যুগপৎ খোদার একত্ব এবং আদমকে সেজদা করার হুকুম করার মধ্যে স্ববিরোধ আছে। কিন্তু স্বর্গীয় আদেশে স্ববিরোধ থাকতে পারে না। এখানে কি তবে এমন কোনো ইঙ্গিত আছে যে আদম খোদার অংশ? লালন ফকির এই তত্ত্বকে গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন:
‘আপন ছুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়
নইলে কি ফেরেশতারে
সেজদা দিতে কয়॥
আল্লা আদম না হইলে
পাপ হইত সেজদা দিলে
শেরেক পাপ যারে বলে
এ দীন দুনিয়ায়॥’
পশ্চিমে একটা ভজঘট চলছে, ইসলামকে সন্ত্রাসের সঙ্গে অভিন্ন করে বুঝতে হবে। একদিকে এই নতুন ‘বিদ্যে’র চোখ রাঙানি, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক জোশে বিভিন্ন সমাজের ঠোরাঠুরি- এ দুই দিককার ঠেলা সামলাতে হাল্লাজের এ বই একটা জুতসই জবাব হতে পারে। বাংলার লৌকিক চিন্তায় পারস্যের সুফির ক্বালবের প্রতিধ্বনি শুনতেই শুধু নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রণোদনা থেকেও এ বই পাঠ্য হতে পারে।
অনুবাদের ক্ষেত্রে রায়হান রাইন যথাসম্ভব মূলানুগ থেকেছেন। সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল করেছেন, অর্থের অন্যথা না হয়। এদিকে নজরদারি রাখতে গিয়ে রূপের দিকটায় কিছুটা ঢিল পড়েছে, অনুবাদ সর্বত্র সমানভাবে প্রাঞ্জল হয়নি। নিজের ভূমিকায় তিনি প্রাসঙ্গিক আলোচনার পাশাপাশি বাংলার ভাববিগ্রহের সঙ্গে সুফিবাদের সম্পর্ক যাচাই করেছেন। সেটা এ বইয়ের একটি বাড়তি পাওনা। মনসুর আল-হাল্লাজ বাংলায় বহুকাল ধরে পঠিত, অনুবাদক যার একটি সাবুদ লালনের গান থেকে তুলে দিয়েছেন:
‘মনছুর হাল্লাজ ফকির সেত
বলেছিল, আমি সত্য
সই পলো সাঁইর আইন মতো
শরায় কি তার মর্ম পায়॥
আমি কি তাই জানলে সাধন সিদ্ধ হয়।’
অনুবাদক তাই নিঃসন্দেহে জানাতে পারছেন, ‘মনসুর আল-হাল্লাজের মরমি তত্ত্বের পরিচয় বাংলার ভাবসাধনাকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে।’

প্রকাশের তারিখ: 2011-03-07

Posted in Uncategorized | Comments Off

মাইজভাণ্ডারী সম্প্রদায় ও তাদের গান

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানায় মাইজভাণ্ডারী নামে একটি ধর্মমত গড়ে ওঠে। মাইজভাণ্ডার গ্রামের নামেই এই সম্প্রদায়ের নাম করণ, পরিচিতি ও বিস্তার। চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, ফেনি, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মবাড়িয়া প্রভৃতি জেলার অজস্র মানুষ এই ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এর অনুসারীদের দেখা যায়। ধর্মীয় সমন্বয়বাদীতা, মুক্ত চিন্তা প্রভৃতি গুণাবলীকে ধারণ করে মাইজভাণ্ডারী তরিকার বিস্তার ঘটেছে। মাজার-আখড়া-খানকাকে কেন্দ্র করে জনমনে লৌকিক-অলৌকিক যে বিশ্বাস সক্রিয় মাইজভাণ্ডারী সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতাকে বহন করে। এই তরিকা বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিব্যাপ্ত। প্রতিদিন অজস্র আশেক জনতার আগমন এই তরিকার বিশেষত্বকে নির্দেশ করে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে এই তরিকাটি মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আসছে। মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী। তিনি ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে মাইজভাণ্ডার গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন এবং সুদীর্ঘ ৮০ বছর জীবন-যাপনের পর ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মাইজভাণ্ডার গ্রামই তাঁর আখড়ায় দেহ রাখেন। এটি উদার ও মানবতাবাদী একটি লোকসম্প্রদায়। মরমি ও অধ্যত্ম সাধনার মাধ্যমে জীবন যাপনই এই সম্প্রদায়ের পরম লক্ষ্য। শরীয়তকে স্বীকার করেও মারেফতি সাধনার প্রতি অনুসারীদের উৎসাহিত করা এবং জিকির ও হালকা প্রভৃতি রীতিতে ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করা এ সম্প্রদায়ের সাধনার অঙ্গ। মাইজভাণ্ডারী তরিকা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এই তরিকার অনুসারী হওয়া যায়। এই তরিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমবেত জিকিরাদির মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ অনুসন্ধান। এদের রয়েছে অজস্র সাধন সঙ্গীত। এই সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তাদের সাধন পদ্ধতি প্রতিফলিত হয়।
মাইজভাণ্ডারী পীর প্রাথমিক পর্বে তাঁর নৈমিত্তিক কর্মক্রিয়া ও সাংগঠনিক ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিবেশিজনের নিকট আপন হয়ে ওঠেন। তৎকালীন সময়ে একজন আইনজ্ঞ এবং সর্বোপরি একজন মাদ্রাসা শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করায় তার পক্ষে সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক সংকট আত্যস্ত করা সহজ হয়ে ওঠে। তিনি সে সময়কার বাঙালি মুসলমান বিশেষ করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দীনতা-হীনতা এবং নানা শ্রেণি-গোষ্ঠীর ধর্মীয় জীবনে বিদ্যমান অসহিষ্ণুতার ভয়াবহতা অনুধাবন করেন। এই সকল সংকটকে অনুধাবন করে নিজের মতো করেই এর সমাধানে মনোনিবেশ করেন। মানুষের আর্থ-সামাজিক সংকট থেকে সৃষ্ট ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্রতা প্রশমনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত চেষ্টাই নতুন এক ভাবনার উদ্রেক করে। এই ভাবনা অন্যদের নিকট যেমন অভিনব হয়ে ওঠে তেমনি তাঁর নিজের দায়িত্ববোধকেও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে একজন গার্হস্থ্য পীরের আসনে আসীন হয়েই তিনি ভবঘুরে, ঘরছাড়া, অনাথ, দরিদ্র মানুষের আশ্রয় হয়ে ওঠেন। তিনি দরিদ্রের যেমন অন্নদাতা তেমনি ধনীর আত্মিক ক্ষুধা নিবারক হিসেবে পরিচিতি পান।
উনবিংশ শতাব্দিতে একজন বাঙালি শিক্ষিত মুসলমানের অভিনব এই কর্ম প্রচেষ্টা সমকালে অনেক মানুষকেই আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে বাঙালি দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাঁর প্রথম জীবনের অনুসারী হলেও শিক্ষা ও দূরদর্শী বাচন ক্ষমতা তাঁকে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর নিকট পরিচিত করে তোলে। উপরন্তু তাঁর দৃষ্টিতে সৃষ্ট সামাজিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য ধর্মীয় মাধ্যম ব্যতিরেকে অন্য কোনো পথ নির্বাচন সহজ ছিলো না। তাঁর নিরীক্ষণে ধর্মীয় সংকটই এই গাঙ্গেয় ভূ-খণ্ডে প্রধান হয়ে দেখা দেয়। একারণে তিনি ধর্মীয় পথেই এই সমাধানের চেষ্টা করেন। মূলত তিনি মনে করেন ধর্মীয় জীবনের অজ্ঞতাই মানুষের সামাজিক সংকট সৃষ্টির মূল কারণ। কারণ তিনি অধ্যত্ম ভাব পরিমণ্ডলের অসহিষ্ণু অবস্থাকেই প্রধান হিসেবে দেখেন। আর এই পথেই তাঁর সংস্কার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে উদগ্রীব হন। মূলত তিনি একজন ধর্ম সংস্কারকের ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হলেও পরবর্তীতে তাঁর কর্মপরিধি তাকে সমাজ সংস্কারকের আসনে আসীন করে। তিনি ধর্মকে শুধু অধ্যত্ম জীবনের উপকরণ মনে করেননি। কিংবা একটি পথকেই সর্বশ্যেষ্ঠ বলে মেনে নেননি। তাই দেখা যায় যখন কোনো হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ তাঁর দূরদর্শী ক্ষমতার নিকট আত্মসমর্পন করে আপন ধর্ম ত্যাগ করতে মনস্থ করে তখন তিনি স্বধর্মে থেকে জীবনাচারের নির্দেশ দান করেন। এই সকল মহাত্মাসুলভ আচরণই তাঁকে হাজার জনের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলো। তাঁর নিতট ধর্ম আপন সংস্কৃতি বিচ্যুত কোনো বিষয় নয়। তাই তিনি আরব-ইরানীয় আরোপিত মতবাদকে শ্রেষ্ঠ বলে দ্ব্যর্থহীন ভাবে মেনে না নিয়ে আপন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ধর্ম পালনে মতি হন।
উনবিংশ শতাব্দীর মাদ্রাসার শিক্ষায় পাঠ নেওয়া এক জন মানুষ হয়েও স্ব সংস্কৃতির প্রতি মমত্ববোধ তাঁর দূরদর্শীতার পরিচয়কে বহু গুণ ত্বরান্বিত করে। পশ্চিমা শিক্ষা ও ধ্যান-ধারণা দ্বারা আবিষ্ট হয়ে ভিন্ন ধর্মী মাতাদর্শ গ্রহণ ও সেটি দ্বারা সমাজ সংস্কার তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি ধর্ম দিয়েই সমাজ সংস্কারের কথা চিন্তা করেন। যদিও তাঁর পথটিও সহজ-সাধারণ হয়ে ওঠেনি। সেখানেও ছিলো অনেক বাহাস, নিন্দা, সমালোচনা। তিনি সমস্ত কিছু অতিক্রান্ত হয়ে একজন সমন্বিত ভাব ধারা প্রবর্তন করেন। যা আজও বহু মানুষের অধ্যত্ম বিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করে।
এই তরিকা ক্রমে মাইজভাণ্ডার গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম জেলাসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রসারিত এবং এর ভক্ত সংখ্যা অসংখ্য। মাইজভাণ্ডারিদের মধ্যেও সাধন সংগীত চর্চা বর্তমান। এসব গানে তাঁদের অধ্যত্মতত্ত্ব ও বিভিন্ন প্রশস্তি প্রতিফলিত হয়। মাইজভাণ্ডারি সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিব্যাপ্ত গানগুলো মাইজভাণ্ডারি গান নামে পরিচিত। মাইজভাণ্ডারি তরিকার একজন অন্যতম ভক্ত ছিলেন কবি রমেশ শীল। তিনি হিন্দু হয়েও মাইজভাণ্ডার পীরের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি নিবেদন করে। তাঁর সমগ্র কবি জীবনে তিনি অসংখ্য মাইজভাণ্ডারি গানের সৃষ্টি করেছেন। আসরে কবিগান পরিবেশনের সময়ও তিনি মাইজভাণ্ডার পীরের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতেন। কবি রমেশ শীলের রচিত অন্যতম দুটি মাইজভাণ্ডারি গান হলো
(১)
ভাণ্ডারীর মহিমা অপার ভাণ্ডারীর মহিমা অপার
দোজাহানের মালিক বাবা মাওলা মাইজভাণ্ডার
প্রেম শিক্ষা দিতে এলে, গাওচুল আজম নাম ধরিলে,
শেষ জামানায় উদয় হল প্রেমের অবতার ॥
সর্ববাঞ্ছা পূর্ণ করে, দৃষ্টিমাত্র বুঝতে পারে,
রূহানীতে কার্য্য সারে মহিমা বাবার
তার ভাবেতে বেখোদ হলে, তার ভাবেতে প্রাণ সঁপিলে
আওলিয়ার দপ্তরে নাম উঠিবে তাহার ॥
বিবেক বলে হাসি হাসি রমেশ কেন তুই রইলি বসি
চলনা একবার দেখে আসি আওলিয়ার দরবার ॥

(২)
নিদানের বন্ধু আমার গাওচুল আজম মাজইভাণ্ডারী,
গাওচুল আজম মাইজভাণ্ডারী গাওচুল আজম মাইজভাণ্ডারী
তুমি হর্তা, তুমি কর্তা, তুমি পাতকী ত্রাতা,
তুমি আমার মুক্তিদাতা ওরে দয়াল মাইজভাণ্ডারী
শয়নে স্বপনে আমি, সদা ভাবি তুমি তুমি
যা কর তা কর তুমি, থাক্ব নূরী কদম ধরি ॥
অন্ধকারে মায়ার কোলে, আমায় দিওনা ফেলে,
আমি তোমার অবোধ ছেলে, ত্বরায়ে লও ত্বরা করি ॥
থাক তুমি পর্দ্দার আরে, ফিরাও মোরে দ্বারে দ্বারে
এরূপ করে রমেশেরে কাঁদাবে কি জন্ম ভরি ॥
মাইজভাণ্ডারী পীরের অনুসারী সাধারণ নিুবিত্তের মানুষ যেমন আছে তেমনি আছে অর্থশালী ও সামাজিক প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি বর্গও। সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই ধর্মের প্রভাব থাকলেও এটি লোক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। ইসলামের আবহে প্রচার-প্রসার ঘটলেও অনুসারীগণ সর্বধর্ম হতে আগত। আবার ইসলামী শাস্ত্রীয় রীতির হুবহু অনুকরণ তাদের স্বভাবজাত নয়। শরিয়তী রীতি-নীতির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন মাইজভাণ্ডারী রীতির বৈশিষ্ট্য। তারা ঈশ্বরকে আশেকে মাশুক হিসেবে দেখে এবং নিজের আত্মার মধ্যে স্রষ্টাকে অনুভব করে। স্রষ্টাকে তারা হালকা ও জিকিরের মধ্য দিয়ে স্মরণ করে। এদের বাৎসরিক ওরসে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে। নিজস্ব সাধন সংগীত সম্প্রদায় মধ্যে ধর্মীয় অনুসঙ্গ হিসেবে চর্চিত হয়। এই সঙ্গীতগুলো ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ নামে পরিচিত। বর্তমানে মাইজভাণ্ডারী গান শুধু ধর্মীয় সঙ্গীত হিসেবেই নয় লোকসঙ্গীতের একটি সমৃদ্ধশালী শাখা হিসেবে পরিচিত।
খানকা কেন্দ্রিক মহাসম্মেলন আর আশেক ভক্তের ভাববেগকে আশ্রয় করে আসক্তি গড়ে ওঠে। আর এই আসক্তি থেকেই আশেকগণ জীবনের উপযোগ নিবারণের পন্থা আবিস্কার করে। মাইজভাণ্ডারী তরিকায় শুধু তত্ত্বিকভাবে অন্যান্য তরিকা থেকে স্বতন্ত্র বিবেচিত হয় না। এই তরিকার কিছু আচার ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সকল বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত দরবার বা মাজার-আখড়াকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। অচারের স্বতন্ত্র রূপ সাধারণত ওরশ-খোশরোজের সময় বেশি পরিলক্ষিত হয়। মাইজভাণ্ডার শরিফের বিশেষ-বিশেষ ওরশ ও খোশরোজ সমূহ হলো —
* ১০ মাঘ, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারি মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী {হযরত কেবলা} [১৮২৬Ñ১৯০৬]-এর বার্ষিক ওরশ শরিফ।
* ২২ চৈত্র, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ্সুফি সৈয়দ গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারী (হযরত বাবা ভাণ্ডারী){১৮৬৫Ñ১৯৩৭}-এর বার্ষিক ওরশ শরিফ।
* ২৭ আশ্বিন, হযরত বাবা ভাণ্ডারীর খোশরোজ শরিফ।
(বর্তমানে এই অনুষ্ঠানটি বাংলা তারিখের পরিবর্তে ইংরেজি ১৪ অক্টোবর তারিখ অনুষ্ঠিত হয়।)
* ১০ পৌষ, গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর প্রপৌত্র শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (শাহানশাহ বাবাজান) {১৯২৮Ñ১৯৮৮}-এর খোশরোজ শরীফ।
* ২৬ আশ্বিন, শাহানশাহ বাবাজানের বার্ষিক ওরশশরিফ।
* ৭ ফাল্গুন, হযরত বাবাভাণ্ডারির পুত্র শাহজাদা সৈয়দ শফিউল বশর মাইজভাণ্ডারী (জন্ম- ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ)-এর খোশরোজশরিফ।
মাইজভাণ্ডারি ধর্ম একটি সমন্বিত ধর্ম। নিজস্ব ক্রিয়া-করণ ও চর্চার স্বতন্ত্র ধরণ বিদ্যমান থাকলেও ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে এই ধর্মের অনুসারীগন মুসলমান হিসেবে পরিচিত। ফলে একটি উদার-মানবতাবাদী ধর্ম হলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের বাইরে এর মুরিদ হওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। তবুও মুসলমান সম্প্রদায়ের বাইরে অজস্র মানুষ মাইজভাণ্ডার পীরের প্রতি তাদের ভক্তি নিবেদন করে। বিপদে-আপদে তাঁর স্মরণ নেয়। তদরগায় মানৎ করে। শিরণী দেয়। ওরসের দিনে সকলে তবারক গ্রহণ করে। ভক্তিচিত্তে জিকিরাদিতে অংশগ্রহণ করে। আল্লাহ, নবী, অলি-আওলিয়া, মাইজভাণ্ডারপীর প্রভৃতির প্রশস্তিমূলক গান গায়। ভক্তের নিকট ‘গাইছুল আজম মাইজভাণ্ডারী’ হলেন, সৈয়দ আহমদ উল্লাহ, ‘বাবা ভাণ্ডারী’ হলেন সৈয়দ গোলামুর রহমান, সৈয়দ মোহম্মদ হাসান ‘মওলাবাবা’ অভিধায় ভূষিত। ইসলামী সুফি ধারা ও সামা সংগীতের প্রভাবজাত এই ধর্মীয় ধারা। মাইজভাণ্ডারি ধর্মের দর্শন হলো বিশ্ব মানবে এক পরিবারের সদস্য মনে করা। বর্তমানে বাংলাদেশে এই ধারার বেশ প্রভাব বিদ্যমান।

http://www.shapludu.com/1418/05/article_details.php?article_serial=76

Posted in Uncategorized | Comments Off

আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনের সমাপনী দিনে বক্তারাবিত্তের আরাধনা নয় চিত্তের সাধনাই সূফিদের বৈশিষ্ট্য

নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে মাইজভাণ্ডারী একাডেমী আয়োজিত দু’দিনব্যাপী তৃতীয় আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল শনিবার দেশি-বিদেশি সূফি গবেষকরা বলেছেন, সকল মানুষের আকাঙক্ষা হচ্ছে শান্তি ও স্বস্তি। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ যাদের দ্বারা পরিচালিত তারা নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব প্রতাপ ও প্রতিপত্তির প্রয়াসী। দাপট প্রদর্শনের অশুভ প্রতিযোগিতায় তারা মানুষের জীবন থেকে শান্তি ও স্বস্তি কেড়ে নিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাস, নিপীড়ন ও জুলুম। বক্তারা বলেন, জুলুমবাজ নেতারাই ‘সন্ত্রাস’ বলে এমন এক মাতম তুলেছে যাতে কে আক্রমণকারী আর কে আক্রান্ত তা বোঝাই যায় না। বিত্তের আরাধনা নয় চিত্তের সাধনাই সূফিদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তারা বলেন, সূফিরা সম্পদের পূজা করে না। সম্পদকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে। বিত্তের প্রকাশে নয় চিত্তের বিকাশেই মানুষের মর্যাদা শীর্ষমুখী হয়। বস্তুবাদ, রাজনৈতিক আধিপত্য ও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে সূফিদের সমন্বয়ধর্মী ভালবাসাভিত্তিক দর্শনের চর্চা ও অনুশীলন অপরিহার্য উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, হাত আছে বলেই হাতাহাতি-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়তে হবে তা সূফিদের দর্শন নয়। অথচ এখন চলছে বিশ্বজুড়ে হাতিয়ে নেয়ার অর্থনীতি। মানুষ একদিকে অর্থনৈতিক মুক্তি খুঁজছে আর অন্যদিকে ওঁৎ পেতে আছে কিভাবে কার কাছ থেকে সবকিছু হাতিয়ে নেয়া যায়। বিশ্ববাসীকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে হলে সম্পদের সুষম বণ্টনের পাশাপাশি মানুষের হাতকে করতে হবে বণ্টনের হাত ও ত্যাগের হাত; লুণ্ঠনের হাত নয়। মাইজভাণ্ডারী সূফিরা এ পথেই মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর সহ-সভাপতি ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন এন্ড সোস্যাল সায়েন্সের ডিন প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সূফি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষাবিদ-ইসলামী চিন্তাবিদ সালাহ উদ্দিন কাশেম খান। কুরআন মজিদ থেকে তেলাওয়াত, নাতে রাসূল (দ.) ও মাইজভাণ্ডারী সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিকেল ৫টায় সূফি সম্মেলন শুরু হয়। আসন গ্রহণের পর অতিথি ও আলোচকদের মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর পক্ষ হতে ক্রেস্ট ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সম্মেলন শেষে হযরত গাউসুল আযম আবদুল কাদের জিলানী (র)-এর ওরশ এবং মাজার পরিচর্যার ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। সবশেষে মাইজভাণ্ডারী মরমী শিল্পীদের পরিবেশনায় মাইজভাণ্ডারী ভক্তিমূলক গান মাহফিলে সেমা অনুষ্ঠিত হয়। সূফি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মাইজভাণ্ডার শরিফ গাউসিয়া হক মন্‌জিলের সাজ্জাদানশীন আলহাজ্ব হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মজিআ) প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. মঈন উদ্দিন আহমদ খান, মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর সভাপতি প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, আলহাজ্ব রেজাউল আলী জসিম চৌধুরী, জামাল আহমদ সিকদার, অধ্যাপক এ ওয়াই এম জাফর, মাইজভাণ্ডারী গবেষক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর। এতে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মালয়েশিয়া আইএআইএস এর রিচার্স ফেলো ড. এরিক উইংকেল, মিশর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক শরিয়াহ এর অধ্যাপক ড. আহমদ মাহমুদ আবদুল্লাহ কারিমা, মালয়েশিয়ার কবি ইশরাফ হোসেন, ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ড. এম শমসের আলী, গবেষক মুহাম্মদ ওহীদুল আলম, ড. জিনবোধি ভিক্ষু, ফাদার যোসেফ জীবন গমেজ। বিদেশী আলোচকদের বক্তব্য বাংলায় ভাষান্তর করে শোনান আল্লামা মোহাম্মদ শায়েস্তা খান আল আজহারী। প্রধান অতিথি সালাহ্‌ উদ্দিন কাশেম খান বলেন,অশান্তি-সংঘাতে পৃথিবীবাসী শংকিত ও উদ্বিগ্ন। এই অশান্ত-দ্বন্দ্বমুখর আবহ থেকে পরিত্রাণ পেতে এ আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলন আয়োজন। সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাইজভাণ্ডারী দর্শন ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির উত্তরাধিকার বহনকারী একটি জীবন্ত ও জীবন ঘনিষ্ঠ দর্শন। কুরআনের বাণীর নিরিখে ও প্রিয় নবীর (দ:) শিক্ষার আলোকে এ দর্শনের ভেতর ও বাইরের রূপ নির্ণীত ও আলোকিত হয়েছে। তাই মাইজভাণ্ডারী দর্শনকে বুঝতে হলে কুরআনকে বুঝতে হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

http://www.dainikazadi.org/ononno_details.php?news_id=15292#.T1xPz1FoQQw.facebook

Posted in Uncategorized | Comments Off

আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনের সমাপনী দিনে বক্তারাবিত্তের আরাধনা নয় চিত্তের সাধনাই সূফিদের বৈশিষ্ট্য

নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে মাইজভাণ্ডারী একাডেমী আয়োজিত দু’দিনব্যাপী তৃতীয় আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল শনিবার দেশি-বিদেশি সূফি গবেষকরা বলেছেন, সকল মানুষের আকাঙক্ষা হচ্ছে শান্তি ও স্বস্তি। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ যাদের দ্বারা পরিচালিত তারা নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব প্রতাপ ও প্রতিপত্তির প্রয়াসী। দাপট প্রদর্শনের অশুভ প্রতিযোগিতায় তারা মানুষের জীবন থেকে শান্তি ও স্বস্তি কেড়ে নিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাস, নিপীড়ন ও জুলুম। বক্তারা বলেন, জুলুমবাজ নেতারাই ‘সন্ত্রাস’ বলে এমন এক মাতম তুলেছে যাতে কে আক্রমণকারী আর কে আক্রান্ত তা বোঝাই যায় না। বিত্তের আরাধনা নয় চিত্তের সাধনাই সূফিদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তারা বলেন, সূফিরা সম্পদের পূজা করে না। সম্পদকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে। বিত্তের প্রকাশে নয় চিত্তের বিকাশেই মানুষের মর্যাদা শীর্ষমুখী হয়। বস্তুবাদ, রাজনৈতিক আধিপত্য ও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে সূফিদের সমন্বয়ধর্মী ভালবাসাভিত্তিক দর্শনের চর্চা ও অনুশীলন অপরিহার্য উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, হাত আছে বলেই হাতাহাতি-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়তে হবে তা সূফিদের দর্শন নয়। অথচ এখন চলছে বিশ্বজুড়ে হাতিয়ে নেয়ার অর্থনীতি। মানুষ একদিকে অর্থনৈতিক মুক্তি খুঁজছে আর অন্যদিকে ওঁৎ পেতে আছে কিভাবে কার কাছ থেকে সবকিছু হাতিয়ে নেয়া যায়। বিশ্ববাসীকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে হলে সম্পদের সুষম বণ্টনের পাশাপাশি মানুষের হাতকে করতে হবে বণ্টনের হাত ও ত্যাগের হাত; লুণ্ঠনের হাত নয়। মাইজভাণ্ডারী সূফিরা এ পথেই মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর সহ-সভাপতি ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন এন্ড সোস্যাল সায়েন্সের ডিন প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সূফি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষাবিদ-ইসলামী চিন্তাবিদ সালাহ উদ্দিন কাশেম খান। কুরআন মজিদ থেকে তেলাওয়াত, নাতে রাসূল (দ.) ও মাইজভাণ্ডারী সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিকেল ৫টায় সূফি সম্মেলন শুরু হয়। আসন গ্রহণের পর অতিথি ও আলোচকদের মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর পক্ষ হতে ক্রেস্ট ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সম্মেলন শেষে হযরত গাউসুল আযম আবদুল কাদের জিলানী (র)-এর ওরশ এবং মাজার পরিচর্যার ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। সবশেষে মাইজভাণ্ডারী মরমী শিল্পীদের পরিবেশনায় মাইজভাণ্ডারী ভক্তিমূলক গান মাহফিলে সেমা অনুষ্ঠিত হয়। সূফি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মাইজভাণ্ডার শরিফ গাউসিয়া হক মন্‌জিলের সাজ্জাদানশীন আলহাজ্ব হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মজিআ) প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. মঈন উদ্দিন আহমদ খান, মাইজভাণ্ডারী একাডেমীর সভাপতি প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, আলহাজ্ব রেজাউল আলী জসিম চৌধুরী, জামাল আহমদ সিকদার, অধ্যাপক এ ওয়াই এম জাফর, মাইজভাণ্ডারী গবেষক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর। এতে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মালয়েশিয়া আইএআইএস এর রিচার্স ফেলো ড. এরিক উইংকেল, মিশর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক শরিয়াহ এর অধ্যাপক ড. আহমদ মাহমুদ আবদুল্লাহ কারিমা, মালয়েশিয়ার কবি ইশরাফ হোসেন, ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ড. এম শমসের আলী, গবেষক মুহাম্মদ ওহীদুল আলম, ড. জিনবোধি ভিক্ষু, ফাদার যোসেফ জীবন গমেজ। বিদেশী আলোচকদের বক্তব্য বাংলায় ভাষান্তর করে শোনান আল্লামা মোহাম্মদ শায়েস্তা খান আল আজহারী। প্রধান অতিথি সালাহ্‌ উদ্দিন কাশেম খান বলেন,অশান্তি-সংঘাতে পৃথিবীবাসী শংকিত ও উদ্বিগ্ন। এই অশান্ত-দ্বন্দ্বমুখর আবহ থেকে পরিত্রাণ পেতে এ আন্তর্জাতিক সূফি সম্মেলন আয়োজন। সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাইজভাণ্ডারী দর্শন ইসলামের বিশ্বদৃষ্টির উত্তরাধিকার বহনকারী একটি জীবন্ত ও জীবন ঘনিষ্ঠ দর্শন। কুরআনের বাণীর নিরিখে ও প্রিয় নবীর (দ:) শিক্ষার আলোকে এ দর্শনের ভেতর ও বাইরের রূপ নির্ণীত ও আলোকিত হয়েছে। তাই মাইজভাণ্ডারী দর্শনকে বুঝতে হলে কুরআনকে বুঝতে হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

http://www.dainikazadi.org/ononno_details.php?news_id=15292#.T1xPz1FoQQw.facebook

Posted in Uncategorized | Comments Off